রবিবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৫ ।। ২২ চৈত্র ১৪৩১ ।। ৮ শাওয়াল ১৪৪৬


আপনি কেমন মাদরাসায় ভর্তি হবেন? 

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| মুফতি আবু নাঈম ফয়জুল্লাহ ||

কওমি মাদরাসায় ভর্তির সময় চলে এসেছে। সামনে কঠিন ভর্তিযুদ্ধ। অনেকে মাদরাসা নির্বাচন করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যান। ঠিক কী কী বৈশিষ্ট্য দেখে মাদরাসা ঠিক করবেন তা নির্ধারণ করতে কষ্ট হয়। কারো কাছে পরামর্শ চাইলে সাধারণত তিনি যে প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সেই প্রতিষ্ঠানের কথা বলেন। অনেকে তো ছাত্রদেরকে পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে উঠে কথা বলার মতো উদারতাটুকু রাখেন না। মাদরাসা যত মন্দই হোক নিজে যেই মাদরাসার শিক্ষক পরিচিত ছাত্রদেরকে সেখানে এনেই ভর্তি করাতে হবে এমন একটা অসুস্থ চিন্তা আমাদের মাঝে আছে। এটা দুঃখজনক ও খতরনাক ব্যাপার। 

যেসকল তালিবে ইলম নিজেরা মাদরাসা নির্বাচন করেন তারা সাধারণত দেখেন, বেফাকের রেজাল্টে কোন মাদরাসা কতটা এগিয়ে? আসলে রেজাল্ট ভালো হওয়াই কি একটি মাদরাসার সফলতার মানদন্ড? 

কোনো মাদরাসা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় খেয়াল করা উচিৎ : 

১. যোগ্য ও আদর্শ আসাতিযা : 

মানুষ গড়ে ওঠে মানুষের সংস্পর্শে। আপনি যে জামাতে ভর্তি হবেন সেই জামাতের দায়িত্বশীল উস্তায কেমন? বিশেষত যারা দরস দিবেন তাদের মধ্যে 'হক আদায় করে পড়ানো'র মতো কয়জন আছেন? সবাই সমান তো হবে না। আপনাকে মি'য়ারী কিতাবগুলোর দরসদানকারীদের খোঁজ নিতে হবে। বেশির ভাগ শিক্ষক ভালো কিনা খেয়াল করতে হবে। 

অনেকেই এ ক্ষেত্রে একটা ভুল করেন, দেখা যায়, কোনো মাদরাসায় বড় কোনো আলেম আছেন, যিনি জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। অনেকে শুধু তার দিকে তাকিয়ে মাদরাসা নির্ধারণ করে ফেলেন। অথচ নিজে যে ক্লাসে ভর্তি হবে সেখানে ওই বড় আলেমের কোনো দরস নেই। পরে দেখা যায়, দুই একজন উপরের দিকের শিক্ষক ছাড়া কেউ যোগ্য না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন বড় আলেম, তিনি নিজের ফরমাবরদার ছাত্রদেরকে নিয়োগ দিয়ে মাদরাসা ভরে ফেলেছেন। আর এইসব অযোগ্য শিক্ষকরা নিজেদের শায়েখের নানা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের বয়ান দিয়ে ছাত্রদেরকে ভর্তি করে যাচ্ছেন। 

যারা উপরের দিকের ক্লাসে পড়বেন তাদের খেয়াল রাখতে হবে, মাদরাসায় 'মাহেরে ফন' উস্তায আছেন কিনা। মাহেরে ফন বলতে আমি বুঝাতে চাচ্ছি, যারা নির্দিষ্টভাবে কোনো একটা শাস্ত্রে পারদর্শী। নির্দিষ্ট কোনো ইলমি সাবজেক্টে গভীর জ্ঞান রাখেন। এই ধরণের কয়েকজন উস্তায থাকলেই সেই মাদরাসার তালিবে ইলমরা ইলমি গভীরতা নিয়ে বেড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ। 

২. আমলি ও আখলাকি পরিবেশ :

আমলি পরিবেশ বলতে প্রথমত দেখতে হবে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গাঢ় করার জন্য মাদরাসায় কী কী আয়োজন আছে? এরপর ছাত্রদের আচার-আচরণ, উদারতা, সহমর্মিতা, সামাজিকতা ইত্যাদি কেমন হয় তা খেয়াল করা যেতে পারে। 

৩. পড়ালেখার পরিবেশ : 

অনেক মাদরাসায় যোগ্য আসাতিযা ও আমলি পরিবেশ থাকলেও নেগরানির অভাবের কারণে পড়ালেখার পরেবেশটা গড়ে উঠেনি। এমন মাদরাসাও যোগ্য আলেম তৈরির যোগ্য না। পরিবেশ মানুষকে সবচে বেশি প্রভাবিত করে। আপনি কেমন পরিবেশে থাকছেন, কেমন বন্ধু বন্ধবের সাথে দিন কাটাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করবে, আপনার ভবিষ্যৎ কী? 

৪. প্রতিষ্ঠানের চিন্তাগত উদারতা : 

যে প্রতিষ্ঠানে আপনি ভর্তি হবেন তার কর্ণধারগণ দ্বীনের সব শাখার কাজকে সমর্থন করেন কিনা এটা দেখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, আপনি যদি এতটুকু উদারতা নিজের মধ্যে ধারণ করতে না পারেন তাহলে আপনার মাধ্যমে দ্বীনের খেদমতের চেয়ে ঘরানার খেদমত বেশি হবে। ইত্তেফাকের চেয়ে ইখলাফ বেশি ছড়াবে আপনার মাধ্যমে। সামনের দিনগুলোতে সমাজে কাজ করার জন্য ইলমি উদারতা অর্জন করা খুব জরুরি। 

৫. পাঠাগার : 

ইলমের প্রধান উৎস হলো, কিতাবাদি ও বইপত্র। প্রতিষ্ঠানে যদি সমৃদ্ধ পাঠাগার না থাকে তাহলে দরসী কিতাবের বাইরে যে জ্ঞানের বিশাল জগত রয়েছে তার সাথে আপনার পরিচিতি ঘটবে না। 

আর দরসিয়াত দিয়ে কখনো আলেম হওয়া যায় না, শুধু ইলমের পথের সন্ধান পাওয়া যায়। সুতরাং ছাত্র জীবন থেকেই, বিশেষ করে সানাবিয়া স্তর থেকেই নিজের জানাশোনার ডালপালা দরসিয়াতের বাইরে ছড়াচ্ছে কিনা তা খেয়াল রাখতে হবে। এতে আপনার তাখাসসুসের ফন নির্ধারণ করতেও সহজ হবে। ভবিষ্যতের ইলমী সফরটাও আলোকিত হবে। না হয়, গন্তব্যহীন পথিকের মতোই আপনি পথ পাল্টাতে পাল্টাতেই জীবন পার করে দিবেন। ইলমের সাগরে আর ডুব দেয়া হবে না। 

নিজেকে নিয়ে ভাবুন। নিজের ভবিষ্যৎ অন্য কেউ নির্মাণ করে দেবে না। আপনি যা চেষ্টা করবেন তা-ই পাবেন। 

ইবনে সীরিন রহ. এর সেই কথাটা মনে রাখবেন, 'এই ইলম হলো, দ্বীন। সুতরাং তুমি কার কাছ থেকে তা গ্রহণ করছো আগে যাচাই করো।' 

প্রতিষ্ঠাননির্ভর পড়ালেখার এই যুগে যাচাই বাছাইয়ের আবশ্যকতা কোনো অংশে কমে যায়নি বরং বেড়ে গেছে বহুগুণ। বরং এখন যাচাই প্রক্রিয়া আরো জটিল ও রহস্যময় রূপ ধারণ করেছে।

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, সাত মসজিদ, মুহাম্মাদপুর, ঢাকা

এমএইচ/


সম্পর্কিত খবর



সর্বশেষ সংবাদ