|| শোয়াইব আস-সফাদী ||
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল, বুধবার সন্ধ্যায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান সিরিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা চালায়। এই হামলায় লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত সিরিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলো ও গবেষণা কেন্দ্রগুলো—বিশেষ করে হামা, দামেস্কের উপকণ্ঠ এবং হোমসের পূর্বে অবস্থিত টাইফোর (T4) বিমানঘাঁটি। একইসাথে দক্ষিণ সিরিয়ার দারআ ও কুনাইত্রা প্রদেশে স্থল অভিযান ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
এই অভিযানে সবচেয়ে বড় ও সহিংস হামলা চালানো হয় হামা সামরিক বিমানবন্দরের ওপর, যার একটি বিশাল অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। টাইফোর বিমানঘাঁটিরও অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুরো অভিযানজুড়ে লক্ষ্য ছিল বিমানঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা, যা এই তুলনামূলক বড় ধরনের অভিযানের একটি স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর আসাদ সরকারের পতনের পর থেকেই ইসরায়েলি হামলা নিয়মিতভাবেই চলছিল।
ইসরায়েলি হামলার পেছনের কারণ ও উদ্দেশ্য
এই সর্বশেষ হামলায় ইসরায়েলি সরকার, বিশেষত নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার, নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের কৌশলগত প্রয়োজনে এটি করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, গাজায় যুদ্ধ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এই মুহূর্তে সিরিয়ার মতো একটি দুর্বল রাষ্ট্রই ইসরায়েলের জন্য তাদের সামরিক প্রভাব প্রদর্শনের উপযুক্ত ক্ষেত্র।
তবে মূল উদ্দেশ্য আরও গভীর ও কৌশলগত। ইসরায়েলের লক্ষ্য হচ্ছে—সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে একটি "অসামরিক" রাষ্ট্রে পরিণত করা, যাতে ভবিষ্যতে দেশটি ইসরায়েলের জন্য কোনো সামরিক হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে। এই কৌশলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন হলো—আসাদের সরকারের পতন, যে সরকার দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল।
সুতরাং, এই হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, যেখানে ইসরায়েল নিশ্চিত করতে চায় যে সিরিয়া কখনোই তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না।
ইসরায়েলের লক্ষ্য: নতুন সিরিয়ার সামরিক পুনর্গঠন রোধ করা
ইসরায়েল অব্যাহতভাবে বোমাবর্ষণ, স্থল অভিযান এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে—যার উদ্দেশ্য হলো সিরিয়ায় যেসব অস্ত্র এখনো অবশিষ্ট আছে, তা ধ্বংস করে ফেলা, যদিও তা পুরনো বা ব্যবহারে অযোগ্যই হোক না কেন।
একইসঙ্গে, ইসরায়েল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে, সদ্য গঠিত নতুন সিরিয়া যেন কখনো একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করতে না পারে— যে সেনাবাহিনীর হাতে থাকবে ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই হামলার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল একটি জোরালো বার্তা দিয়েছে; তারা কাউকেই এই সেনাবাহিনীকে অস্ত্র বা শক্তি সরবরাহ করতে দেবে না, এবং কোনোভাবেই এই সেনাবাহিনীর উন্নয়ন মেনে নেবে না।
ইসরায়েল সিরিয়ায় কী চায়?
বর্তমানে এটা একেবারেই স্পষ্ট যে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সিরিয়ার সঙ্গে তাদের সীমানা বরাবর একটি "ধ্বংসস্তূপ অঞ্চল" তৈরি করতে চায়। এমন একটি এলাকা যা সহজে পর্যবেক্ষণযোগ্য, যে কোনো সময় প্রবেশযোগ্য এবং যেখানে নিয়মিতভাবে অভিযান চালিয়ে তল্লাশি চালানো সম্ভব। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের লক্ষ্য হচ্ছে এমন কোনো গোপন শত্রু ঘাঁটি বা অস্ত্র মজুদের স্থান গড়ে উঠতে না দেওয়া— তা জনগণকেন্দ্রিক কোনো গোষ্ঠী হোক, সুড়ঙ্গ হোক কিংবা কোনো রকমের অস্ত্রাগার।
বৃহত্তর কৌশল, দক্ষিণ দামেস্ক ও আন্তর্জাতিক জোট
এর চেয়েও বিস্তৃত পরিসরে, ইসরায়েল চায় রাজধানী দামেস্কের দক্ষিণাঞ্চল পুরোপুরি সামরিক শক্তি ও অস্ত্রশস্ত্র থেকে মুক্ত থাকুক। তারা এমনকি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে সেখানে তৃতীয় পক্ষের নজরদারি পোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করতে পারে।
তবে, ইসরায়েল স্পষ্টভাবেই তুরস্ককে এই ধরনের কোনো ‘মধ্যস্থতাকারী’ বা পর্যবেক্ষক হিসেবে দেখতে চায় না। বরং রাশিয়াই ইসরায়েলের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিকল্প, কারণ রাশিয়া অতীতে এমন ভূমিকায় ছিল এবং ইসরায়েল তাদের ওপর কিছুটা আস্থা রাখে। অন্যদিকে, রাশিয়া নিজেও সিরিয়ার সংকটে আবার ফিরে আসতে চায়, যদিও তা হয় তেলআবিবের দরজা দিয়ে।
আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তি দমন
সবচেয়ে বিস্তৃত স্তরে, ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হলো—সিরিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এবং এ সংক্রান্ত যেকোনো স্থাপনা বা অবকাঠামো। ইসরায়েল চায় এসব কিছু তার সীমানা থেকে অন্তত ২০০ কিলোমিটার দূরে রাখা হোক অর্থাৎ যেসব এলাকা তারা হামলা করেছে, যেমন পূর্ব হোমস ও হামা।
সুতরাং সংক্ষিপ্ত আকারে বলা যেতে পারে ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য:
• সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলকে একটি ধ্বংসস্তূপ ও নিয়ন্ত্রিত জোনে পরিণত করা।
• দক্ষিণ দামেস্ককে সম্পূর্ণ সামরিকমুক্ত রাখা।
• আঞ্চলিকভাবে রাশিয়ার মতো পক্ষকে ব্যবহার করে নজরদারির ব্যূহ তৈরি করা।
• এবং সিরিয়ার যেকোনো আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া।
এ সবই ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের বার্তা কী?
এই সর্বশেষ ও ব্যাপক ইসরায়েলি বোমা হামলাটি এমন এক সময় হয়েছে যখন উত্তর সিরিয়ার আলেপ্পোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায়, কুর্দিশ-নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যারা সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস বা "কাসদ" নামে পরিচিত, তারা আলেপ্পোর শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়াহ এলাকা থেকে সরে যাচ্ছে।
সিরিয়ায় ঐক্যের বিরুদ্ধে সতর্কতা
এই ঘটনা সম্ভবত সেই চুক্তিকে আরও মজবুত করেছে যা কাসদ-এর নেতা মাজলুম আবদি সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমদ শারার সঙ্গে স্বাক্ষর করেছেন। এই ঐক্য ও সংহতির ইঙ্গিতই ইসরায়েলের জন্য অস্বস্তির কারণ, কারণ এটা তাদের দীর্ঘদিনের কৌশলের বিপরীত। যেখানে তারা সিরিয়ার মানচিত্রকে বিভক্ত, দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছে। এই বোমা হামলা সেই ঐক্যের বিরুদ্ধে একটি সরাসরি বার্তা।
এমএইচ/