202338

মূর্তি ভাস্কর্য বিষয়ে যা বললেন মুফতি আবদুল মালেক

মুফতি আবদুল মালেক।।

জনাব হুমায়ুন আহমেদ-এর ‘এখন কোথায় যাব, কার কাছে যাব’ শীর্ষক নিবন্ধটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নিবন্ধকার ঢাকা বিমানবন্দরের অদূরে, হাজী ক্যাম্পের সামনে থেকে লালন ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার কারণে সরকারের প্রতি ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে হাদীস ও সীরাতের কিছু উদ্ধৃতি এবং কতিপয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, ভাস্কর্য ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং বৈধ ও অনুমোদিত।

নিবন্ধকার যদি ভাস্কর্য শিল্প সম্পর্কে তাঁর নিজের মত বা সতীর্থ বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য উল্লেখ করতেন তবে আমাদের বিশেষ কিছু বলার ছিল না। কিন্তু তিনি ইসলামী আকীদা ও বিধানের উদ্ধৃতি দিয়েছেন এবং খাতামুন্নাবিয়ীন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে সম্পূর্ণ অসত্য কথা বলেছেন। তাই এই বিষয়ে কলম ধরাকে আমরা ঈমান ও আমানতের দাবি বলে মনে করি।

وما توفيقي إلا بالله، عليه توكلت وإليه أنيب.

তিনি প্রথমে যে (অবাস্তব) ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন তা তার ভাষায় এই: আমাদের মহানবী (সা.) কাবা শরীফের ৩৬০টি মূর্তি অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেয়ালের সব ফ্রেসকো নষ্ট করার কথাও তিনি বললেন। হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ল কাবার মাঝখানের একটি স্তম্ভে, যেখানে বাইজেন্টাইন যুগের মাদার মেরির একটি অপূর্ব ছবি আঁকা। নবীজী (সা.) সেখানে হাত রাখলেন এবং বললেন, ‘এই ছবিটা তোমরা নষ্ট করো না।’ কাজটি তিনি করলেন সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর অসীম মমতা থেকে। মহানবীর (সা.) ইন্তেকালের পরেও ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ খলিফাদের যুগে কাবা শরীফের মতো পবিত্র স্থানে এই ছবি ছিল, এতে কাবা শরিফের পবিত্রতা ও শালীনতা ক্ষুণ্ণ হয়নি।

মহানবীর (সা.) প্রথম জীবনীকার ইবনে ইসহাকের (আরব ইতিহাসবিদ, জন্ম : ৭০৪ খৃষ্টাব্দ, মদীনা, মৃত্যু : ৭৬৭ খৃষ্টাব্দ, বাগদাদ) লেখা দি লাইফ অব মোহাম্মদ গ্রন্থ থেকে ঘটনাটি বললাম। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত বইটি অনুবাদ করেছেন আলফ্রেড গিয়োম (প্রকাশকাল ২০০৬, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৫৫২)’’

পর্যালোচনা: এটি একটি অসত্য বর্ণনা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সীরাত যাদের অধ্যয়নে এসেছে এবং প্রাণীর প্রতিকৃতি তৈরি ও তার ব্যবহার সম্পর্কে তাঁর ফয়সালা যারা অবগত আছেন তারা নিজেরাই এ মিথ্যাচার বুঝতে পারেন। তদ্রূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন এবং মক্কা বিজয়ের সময় যেভাবে কাবা শরীফকে সব ধরনের ছবি ও মূর্তি থেকে মুক্ত করেছেন তা যাদের সহীহ হাদীস থেকে অধ্যয়ন করার কিংবা অন্তত নিবন্ধকারের উদ্ধৃতিগুলো পরীক্ষা করার সুযোগ হয়েছে তাদেরও কোনো সন্দেহ থাকবে না যে, ঐ বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বিষয়টা তাদেরকে দলীল-প্রমাণ দিয়ে বোঝানোর প্রয়োজন হবে না। কিন্তু যাদের সামনে এই বিষয়গুলো নেই তারা ওই সীরাত-গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেখে বিভ্রান্তহওয়ার আশংকা রয়েছে।

এজন্য মূল কথাগুলো প্রথমে সংক্ষিপ্ত আকারে আরজ করছি:

১. আলফ্রেড গিয়োম ইবনে ইসহাকের ‘কিতাবুস সীরাত’ অনুবাদ করেননি, করেছেন ইবনে হিশামকৃত ‘সীরাত’ এর অনুবাদ। যদিও প্রচ্ছদে সরাসরি ইবনে ইসহাকের নাম ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু ভূমিকায় তিনি প্রকৃত কথাটা বলেছেন। ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের প্রায় অর্ধশতাব্দী পরের ব্যক্তি। তার মৃত্যু ২১৮ হিজরী তে। অন্যদিকে ইবনে ইসহাকের জন্ম ৮০ হিজরীতে এবং মৃত্যু ১৫০ হিজরীতে।

২. ঐ ঘটনা ইবনে ইসহাকের কিতাবুস সীরাতেও নেই, ইবনে হিশামের কিতাবুস সীরাতেও নেই। অনুবাদক অন্য জায়গা থেকে বর্ণনাটি সংগ্রহ করে সীরাতে ইবনে হিশামে জুড়ে দিয়েছেন।

৩. নিবন্ধকার ইংরেজি অনুবাদের ২০০৬ সালের সংস্করণের ৫৫২ পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে নিজের পক্ষ থেকেও এমন কিছু কথা যোগ করেছেন যা ইংরেজি অনুবাদে নেই।

৪. সর্বশেষ কথা এই যে, ইংরেজি অনুবাদকের জুড়ে দেয়া বর্ণনা এবং হুমায়ূন সাহেবের নিজস্ব বক্তব্য আগাগোড়া বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

একটিমাত্র উদ্ধৃতিতেই যদি এত ‘কান্ড’ থাকে তবে তাকে কী বলা যায়? এবার বিস্তারিত শুনুন।

১. ইবনে ইসহাককে ‘মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রথম জীবনীকার’ বলে দাবি করা ভুল। ইবনে ইসহাকের অনেক আগেই এ বিষয়ের সূচনা হয়ে গিয়েছিল। কেননা, হাদীস শরীফ হল সীরাতের সবচেয়ে বড় ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস আর হাদীস শরীফ গ্রন্থাকারে সংকলন শুরু হয়েছিল ইবনে ইসহাকের জন্মেরও আগে থেকে। দ্বিতীয়ত ইবনে ইসহাকের দাদা উস্তাদ উরওয়া ইবনুয যুবাইরও (জন্ম : ২২হি. মৃত্যু : ৯৪হি.) সীরাত-সংকলকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাহলে ইবনে ইসহাক প্রথম জীবনীকার কীভাবে হচ্ছেন?

ইবনে ইসহাকের পূর্বসূরীদের ‘মাগাযী’ শিরোনামে সংকলিত গ্রন্থগুলো মূলত সীরাত-গ্রন্থ। ইবনে ইসহাকের ‘সীরাত’কেও ‘কিতাবুল মাগাযী’ বলা হয়েছে। [দেখুন: সীরাতে ইবনে ইসহাক, তাহকীক : মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ (ভূমিকা ও গ্রন্থের সূচনা অংশ); তাহযীবু সীরাতে ইবনে হিশাম, আবদুস সালাম হারুন পৃ.৮; তাদবীনে সীরাত ওয়া মাগাযী, মাওলানা কাযী আতহার মোবারকপূরী, প্রকাশনা শায়খুল হিন্দ একাডেমী, দারুল উলূম দেওবন্দ; সীরাতুন্নবী, শিবলী নু’মানী (ভূমিকা অংশ)]

২. ইবনে ইসহাকের ‘কিতাবুস সীরাত’ তার একাধিক শাগরিদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। তাদের একজন যিয়াদ আলবাক্কায়ী। এরই সূত্রে ইবনে হিশাম এই গ্রন্থ গ্রহণ করেছেন এবং সংযোজন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে তার সারসংক্ষেপ প্রস্ত্তত করেছেন।

অত্যন্ত আমানতদারীর সঙ্গে তিনি এই কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনাগুলোর সনদ ও মতন-(সূত্র ও বক্তব্য) হুবহু বর্ণনা করেছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে যা কিছু বাড়িয়েছেন তা ‘ক্বালা ইবনে হিশাম’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনে হিশামের এই রচনা ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’ নামে পরিচিত। যেহেতু সীরাতে ইবনে ইসহাকের পূর্ণ পান্ডুলিপি পাওয়া যায় না তাই একেই সীরাতে ইবনে ইসহাকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আলফ্রেড গিয়োম এই রচনারই, অর্থাৎ সীরাতে ইবনে হিশামেরই অনুবাদ করেছেন এবং এতে সংযোজন-বিয়োজন করেছেন, তবে বিশ্বস্ততা রক্ষা করেননি। যেমন আগেও বলা হয়েছে যে, তিনি সীরাতে ইবনে হিশামকে সীরাতে ইবনে ইসহাক নামে পেশ করেছেন। তদ্রূপ এমন বর্ণনা তিনি এই গ্রন্থে সংযুক্ত করেছেন যা না মূল গ্রন্থে রয়েছে আর না সীরাতে ইবনে ইসহাকের কোনো পান্ডুলিপি বা মুদ্রিত সংস্করণে। আমাদের কাছে ইবনে ইসহাকের ওই গ্রন্থের তিনটি সংস্করণ রয়েছে, কোথাও বর্ণনাটি নেই।

খোদ ইংরেজি অনুবাদকও এই বর্ণনা ওই দুই গ্রন্থের কোনো মুদ্রিত সংস্করণে কিংবা পান্ডুলিপিতে পাননি। তাই তা বন্ধনীর মধ্যে রাখতে বাধ্য হয়েছেন এবং একেই এই সংযুক্তির বৈধতার পক্ষে যথেষ্ট মনে করেছেন। বিষয়টা অনুবাদের বিশ্বস্ততা ক্ষুণ্ণ করে কি না এ দিকে তিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি।

নিবন্ধকার যখন ইংরেজি অনুবাদ থেকে বর্ণনাটা গ্রহণ করেছেন তখন তার বলে দেওয়া অপরিহার্য ছিল যে, অনুবাদে এটা বন্ধনীর মধ্যে রয়েছে, অর্থাৎ বর্ণনাটা সীরাতে ইবনে হিশাম বা সীরাতে ইবনে ইসহাক কোনো গ্রন্থেই নেই।

৩. ইংরেজ অনুবাদক এই বর্ণনাটা আযরাকীকৃত ‘আখবারু মক্কা’ থেকে সংগ্রহ করে সীরাতে ইবনে ইসহাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অথচ আযরাকী ঘুণাক্ষরেও বলেননি যে, এই বর্ণনা সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে। হাঁ, আযরাকীর সনদে ইবনে ইসহাক একজন বর্ণনাকারী হিসেবে রয়েছেন।

আযরাকী ইবনে ইসহাকের শাগরিদ নন, তার অনেক পরের। অতএব আযরাকী থেকে ইবনে ইসহাক পর্যন্ত যে সনদ তা-ও বিচার করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ইবনে ইসহাক এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তবুও এটা প্রমাণিত হয় না যে, এটা তার ‘কিতাবুস সীরাত’-এ রয়েছে? মানুষ সাধারণ আলাপচারিতায় প্রসঙ্গত কোনো ভিত্তিহীন বর্ণনা উল্লেখ করতে পারে (যেমন তার ভিত্তিহীনতা আলোচনার উদ্দেশ্যে) কিন্তু সেটাকে সে ‘সহীহ’ মনে করে না এবং তার রচনায় অন্তর্ভুক্ত করে না।

অনুবাদক এসব বিষয়ে মোটেও অসচেতন নন, কিন্তু যে কোনো উদ্দেশ্যেই হোক বর্ণনাটা এখানে সংযুক্ত করা তার কাছে অপরিহার্য বলে মনে হয়েছে!

৪. এখানে বিষয়টা শুধু এই নয় যে, দলীল-প্রমাণ ছাড়া একটা বর্ণনা সীরাতে ইবনে ইসহাকে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে; বরং আসলে অপরাধ এই যে, একটি মিথ্যা অপবাদ খাতামুন্নাবিয়ীন হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর আরোপ করা হয়েছে।

৫. আযরাকীর (মৃত্যু : ২৪৭ হিজরীর পরে) রচনা ‘আখবারু মক্কা’ থেকে প্রথমে বর্ণনাটির সনদ ও পূর্ণ মতন লক্ষ্য করুন :

أخبرني محمد بن يحى، عن الثقة عنده، عن ابن اسحاق، عن حكيم بن عباد بن حنيف وغيره من أهل العلم، أن قريشا كانت قد جعلت في الكعبة صورا فيها عيسى بن مريم عليهما السلام، قال ابن شهاب : قالت أسماء بنت شعر : إن امرأة ن غسان حجت في حاج العرب، فلما رأت صورة مريم في الكعبة قالت : بأبي وأمي إنك لعربية، فأمر رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يمحوا تلك الصور إلا ما كان من صورة عيسى ومريم.

এই বর্ণনার যে তরজমা গিয়োম করেছেন এবং যার উদ্ধৃতি আমাদের নিবন্ধকার দিয়েছেন তা এই :

I. I. From Hakim b.`Abbad b. Hanif and other traditionists : Quraysh had put picturers in the Ka’ba including two of Jesus son of Mary and Mary (on both of whom be peace!) 1. Shihab said : Asma’ b. Shaqr said that a woman of Ghassan joined in the pilgrimage of the Arabs and when she saw the picture of Mary in the Ka’ba she said, `My father and my mother be your ransom! You are surely an Arab woman!’ The apostle ordered that the pictures should be erased except those of Jesus and Mary.

আলোচিত নিবন্ধে এই অংশটুকুর যে অনুবাদ করা হয়েছে তা মূল ইংরেজি পাঠের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। সেখানে কি এ কথা আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারইয়াম রা.-এর ছবিতে হাত রেখেছিলেন? কিংবা এটা কি আছে যে, এই ছবি বাইতুল্লাহ শরীফে ৬৮৩ খৃ. পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল? তদ্রূপ এ কথাও তো নেই যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টি হঠাৎ কা’বার মাঝখানের স্তম্ভে পড়ল, যেখানে মাদার মেরির একটি অপূর্ব ছবি আঁকা ছিল।

অথচ এই কথাগুলো নিবন্ধকার উপস্থাপন করেছেন গিয়োম-এর অনুবাদ ও সীরাতে ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতিতে।

মূল আরবী গ্রন্থে-সীরাতে ইবনে ইসহাক ও সীরাতে ইবনে হিশামে-আদৌ এই বর্ণনা আছে কি না তা খুঁজে দেখা সম্ভব না হলে অন্তত ইংরেজি অনুবাদের উদ্ধৃতিতে বিশ্বস্ততার পরিচয় দেওয়া কর্তব্য ছিল। প্রকাশক, প্রকাশনার সন এবং পৃষ্ঠানম্বর ইত্যাদি সব কিছু উল্লেখ করে এ ধরনের পরিবর্তন-পরিবর্ধন কি সাধারণ পাঠকের জন্য বিভ্রান্তিকর হয়ে যায় না?

৬. আযরাকীর বর্ণনায় যে বিষয়টুকু পাওয়া যাচ্ছে আমরা প্রথমে তার উপর আলোচনা করব। এরপর নিবন্ধকার যা যোগ করেছেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা যাবে।

আযরাকী ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ইবনে ইসহাক এই বর্ণনার কিছু অংশ হাকীম ইবনে আববাদ ইবনে হানীফ ও জনৈক অজ্ঞাত ব্যক্তির উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন, আর কিছু কথা ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে। ইবনে শিহাব সম্পর্কে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি কিছু কথা আসমা বিনতে শাকার এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন এবং কিছু কথা উদ্ধৃতি ছাড়া।

বর্ণনার এই অংশটুকু সঠিক যে, (জাহেলিয়াতের যুগে) বাইতুল্লাহয় মারইয়াম রা.-এর ছবি ছিল। বিভিন্ন সহীহ বর্ণনায় তা আছে। কিন্তু মক্কা বিজয়ের পর মারইয়াম রা.-এর ছবি না মুছে রেখে দেওয়া হয়েছিল, কিংবা (মাআযাল্লাহ) রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা রেখে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন-এটা নির্জলা মিথ্যা।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুতাওয়াতির ও সুপ্রমাণিত শিক্ষা, তাঁর পবিত্র সীরাতের বাস্তব ঘটনাবলি এবং সহীহ ও মুত্তাছিল হাদীসসমূহের সুস্পষ্ট বক্তব্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইনশাআল্লাহ পাঠকবৃন্দ তা দেখতে পাবেন।

এখন প্রশ্ন এই যে, এই অবাস্তব বিষয়টা কীভাবে, কার কল্যাণে ‘বর্ণনা’র রূপ লাভ করল? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য সনদ বিচার করতে হবে। সনদে একটি নাম আসমা বিনতে শাকার। সে এমনই অজ্ঞাতপরিচয় যে, আসমাউর রিজালের গ্রন্থে তার নামই পাওয়া যায় না। এরপর কোন সূত্রে সে গাসসানের ওই আগন্তুক মহিলার কথা জানতে পেরেছে তারও কোনো উল্লেখ নেই। ইবনে ইসহাককে স্বয়ং ইবনে শিহাব এই তথ্য দিয়েছেন এটা তিনি বলেননি। যদি ভিন্ন কোনো সূত্রে ইবনে শিহাবের বর্ণনা তিনি পেয়ে থাকেন তবে সেই মাঝের সূত্রটি কে তা ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেননি।

মোটকথা, সনদে যেমন শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতা রয়েছে তদ্রূপ উল্লেখিত রাবীদের পরিচয়ও অজ্ঞাত। এধরনের বিচ্ছিন্ন ও অজ্ঞাত সূত্রে প্রাপ্ত বিবরণ দ্বারা দাবি প্রমাণের কাজ চলে না।

কথা এখানেই শেষ নয়। খোদ আযরাকী সম্পর্কেও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা তার সম্পর্কে বিস্তর তালাশ করেছি। একে তো তার সম্পর্কে আলোচনা খুব অল্প গ্রন্থেই পাওয়া যায়। এরপর যারা তার সম্পর্কে লিখেছেন তার সততা ও সত্যবাদিতা এবং তার স্মৃতিশক্তি ও ধীশক্তি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ইমামদের কোনো মন্তব্য আনতে সক্ষম হননি। এজন্য খোদ আযরাকীরই সততা ও বিশ্বস্ততা অজ্ঞাত। আযরাকী থেকে ইবনে ইসহাক পর্যন্ত মাঝের দুটি সূত্রও সন্দেহযুক্ত। সবশেষে ইবনে ইসহাক সম্পর্কেও দেখার বিষয় এই যে, জরহ-তা’দীলের ইমামদের দৃষ্টিতে তাঁর অবস্থান কেমন?

একজন বর্ণনাকারীর কোনো বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তাকে সততা ও সত্যবাদিতা ছাড়াও উত্তম স্মৃতিশক্তি ও ধীশক্তির অধিকারী হতে হয়। এটা অপরিহার্য। এছাড়া তার মধ্যে তাদলীসের প্রবণতা থাকলে দেখতে হবে যে, যার উদ্ধৃতিতে তিনি বর্ণনা করেছেন তার নিকট থেকে সরাসরি ওই তথ্যটা গ্রহণ করেছেন কি না।

‘তাদলীস’ বলতে বোঝায়, একজন রাবী কোনো বিষয় কারো কাছ থেকে সরাসরি শোনেনি, অন্যের মাধ্যমে শুনেছে, কিন্তু বর্ণনার সময় মাঝের সূত্র গোপন রেখে পূর্ববর্তী বর্ণনাকারীর উদ্ধৃতি দিল, যার কারণে শ্রোতা মনে করে যে, কথাটা তিনি সরাসরি উদ্ধৃত ব্যক্তির কাছ থেকেই শ্রবণ করেছেন। অথচ প্রকৃত অবস্থা এমন নয়। যেমন-ইয়াযীদ ইবনে জু’দুবা একটা তথ্য ইবনে ইসহাককে প্রদান করলেন ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে। ইবনে ইসহাক যদি কথাটা ইয়াযীদ ইবনে জু’দুবার নাম উল্লেখ করা ছাড়া ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন তাহলে তা হবে ‘তাদলীস’। বর্ণনাকারীদের পরিচয় ও সময়কাল সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা যেহেতু জানেন যে, ইবনে ইসহাক ছিলেন ইবনে শিহাবের শীষ্য তাই তাদের ধারণা হতে পারে যে, ইবনে ইসহাক তথ্যটা সরাসরি ইবনে শিহাব থেকেই নিয়েছেন। অথচ প্রকৃত বিষয় এমন নয়। ইবনে ইসহাকের সূত্র হল ইয়াযীদ ইবনে ইয়ায। সেই তাকে তথ্যটা সরবরাহ করেছে ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে।

মোটকথা, তাদলীস-প্রবণ বর্ণনাকারীর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য একটি শর্ত এই যে, তিনি যার উদ্ধৃতি দিচ্ছেন তার নিকট থেকে সরাসরি শুনেছেন- এটা পরিষ্কার ভাষায় বলবেন।

বিষয়গুলো যেহেতু ইলমে উসূলে হাদীস ও ইলমে উসূলে ফিকহের স্বীকৃত ও সর্বসম্মত মূলনীতি এবং প্রাচ্যবিদ গবেষকরাও এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন না তাই এ প্রসঙ্গে বরাত উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি না।

আলোচিত বর্ণনার বর্ণনাকারী ইবনে ইসহাকের মধ্যে তাদলীসের প্রবণতা ছিল এবং তার স্মৃতিশক্তি ও ধীশক্তিও আশানুরূপ ছিল না। তার এই দুর্বলতা দুটি সম্পর্কে জরহ-তা’দীলের (বর্ণনাকারীদের গ্রহণযোগ্যতা-অগ্রহণযোগ্যতা বিচার-পর্যালোচনা করার শাস্ত্র) ইমামগণ একমত। এবং উপরোক্ত কারণে তার বর্ণনার মধ্যে কিছু মুনকার (আপত্তিকর ও অবাস্তব) বিষয় ঢুকে পড়েছে-এটাও জরহ-তা’দীল ও ইলালুল হাদীসের ইমামগণের কাছে স্বীকৃত।

বরং অনেক বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত এই যে, কোনো দ্বীনী মাসআলা প্রমাণের জন্য একা ইবনে ইসহাকের বর্ণনা দলীল হতে পারে না। (সিয়ারু আলামিন নুবালা খ : ৭, পৃষ্ঠা : ৪১; মীযানুল ই’তিদাল খ : ৩, পৃ. ৪৭৫ দারুল ফিকর মিসর)

এখানে ইবনে ইসহাকের ‘কিতাবুস সীরাত’কেই দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায়। আমাদের সাধারণ শিক্ষিত শ্রেণী প্রাচ্যবিদদের প্রভাবে একে সীরাতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ বলে মনে করলেও তারীখ, সীরাত ও হাদীসের বিশেষজ্ঞদের বিচারে কিন্তু তা নয়। তারা এই গ্রন্থকে মোটামুটিভাবে সীরাতের একটা ভালো তথ্যসূত্র মনে করেন সঙ্গে সঙ্গে এই সতর্কবাণীও উচ্চারণ করেন যে, এতে মুনকার-মুনকাতে (বিচ্ছিন্ন ও অবাস্তব) বর্ণনাও বিদ্যমান রয়েছে। শামসুদ্দীন যাহাবী রাহ. মীযানুল ই’তিদাল গ্রন্থে (খ. ৩, পৃ. ৪৬৯) অভিযোগ করেছেন যে, ইবনে ইসহাকের ‘কিতাবুস সীরাত’-এ অনেক মুনকার বিষয় রয়েছে যেগুলোর সনদ ‘মুনকাতে’ (বিচ্ছিন্ন)। তদ্রূপ বিভিন্ন্ বানানো কবিতাও তাতে রয়েছে।

জরহ-তা’দীলের ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তানের মন্তব্য উল্লেখ করে যাহাবী বলেন, ‘কাত্তান ইঙ্গিত করেছেন যে, সীরাতে ইবনে ইসহাক-এ কিছু ভিত্তিহীন কবিতা এবং কিছু মুনকাতে-মুনকার রেওয়ায়েত রয়েছে। সুতরাং গ্রন্থটির পরিমার্জিত সংস্করণ তৈরি হলে তা পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’ (সিয়ারু আলামিন নুবালা খ : ৭. পৃষ্ঠা ৫২, মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৪০২ হি.)

দেখুন, বিশেষজ্ঞ মনীষীগণ যেখানে এই গ্রন্থের মুনকার বিষয়গুলো বাদ দিতে বলেছেন সেখানে গিয়োম অন্য স্থান থেকে আরো মুনকার বর্ণনা তাতে প্রক্ষেপণ করেছেন।

পাঠক অনুগ্রহপূর্বক আবার একবার বর্ণনার সনদটা লক্ষ করুন। দেখা যাচ্ছে যে, ইবনে ইসহাক হাকীম ইবনে আববাদ-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, কিন্তু সরাসরি তার কাছ থেকে শুনেছেন-একথা বলেননি। তদ্রূপ ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, কিন্তু সেখানেও সরাসরি শোনার কথা নেই। ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, ইবনে ইসহাক তাদলীস-প্রবণতার শিকার ছিলেন এবং ধরন ও পরিমাণ কোনো দিক থেকেই তা সামান্য ছিল না।

বিশেষজ্ঞ ইমামগণ স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন যে, অনির্ভরযোগ্য ও অজ্ঞাতপরিচয় লোকেরা বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য লোকের উদ্ধৃতিতে যেসব তথ্য বর্ণনা করত তিনি তা গ্রহণ করতেন এবং বর্ণনা করার সময় মধ্যবর্তী সূত্র গোপন রেখে সরাসরি ওই নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির বিবরণ বলে বর্ণনা করতেন। অর্থাৎ তার সনদে জয়ীফ বা মাজহুল রাবী বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তিনি তা গোপন রেখেছেন। তো যে তাদলীসের উদ্দেশ্য সনদ থেকে অনির্ভরযোগ্য রাবী বাদ দিয়ে বাহ্যত ওই সনদকে ‘সহীহ’ বলে প্রকাশ করা তা কত মারাত্মক বিষয় হতে পারে-তা তো বলাই বাহুল্য। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় বহু মুনকার বিষয় এই পথেই অনুপ্রবেশ করেছে।

জরহ-তা’দীলের ইমাম ইবনে হিববান বুসতী (মৃত্যু : ৩৫৪ হিজরী) ইবনে ইসহাকের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করার পর লেখেন, ‘তার সমস্যাটা হল, তিনি জয়ীফ রাবীদের নিকট থেকে রেওয়ায়েত শুনতেন এবং তাদের নাম গোপন রেখে বর্ণনা করতেন। এজন্য তার বর্ণনায় বিভিন্ন মুনকার বিষয় অনুপ্রবেশ করেছে।’ (কিতাবুছ ছিকাত খ. ৭, পৃ. ৩৮৩ হায়দারাবাদ, প্রথম সংস্করণ ১৩৯৩ হি.)

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (মৃত্যু : ৮৫২ হি) লেখেন, ‘ইবনে ইসহাক নিজে সত্যবাদী। তবে জয়ীফ, মাজহুল ও তারও নীচুস্তরের রাবীদের কাছ থেকে বর্ণনা সংগ্রহ করতে এবং তাদের নাম গোপন রেখে বর্ণনা করতে অভ্যস্ত। এই তাদলীস-প্রবণতায় তিনি প্রসিদ্ধ। ইমাম আহমদ, ইমাম দারাকুতনী প্রমুখ তার এই প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছেন। (তা’রীফু আহলিত তাকদীস বিমারাতিবিল মওসূফীনা বিত তাদলীস নং ২২৯)

ইমাম ইবনে হাজার রাহ. ঐ গ্রন্থে তাদলীসকারীদের যে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন তাতে তাকে অন্তর্ভু&ক্ত করেছেন চতুর্থ শ্রেণীতে, যাদের ব্যাপারে তার রায় এই যে, এদের বর্ণনায় যদি উদ্ধৃত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি শ্রবণ করে বর্ণনা করার কথা স্পষ্টভাবে পাওয়া না যায় তবে সর্বসম্মতিক্রমে তা অগ্রহণযোগ্য।

ইমাম ইয়াকুব ইবনে শাইবা (মৃত্যু : ২৬২ হি.)ও তাকে ‘সদূক’ (সত্যবাদী) বলে মন্তব্য করার পর লেখেন, তার সমস্যাটা হল তিনি মাজহুল (অজ্ঞাতপরিচয়) রাবীদের থেকে বাতিল (ভিত্তিহীন) কথা বর্ণনা করে থাকেন। (সীয়ারু আলামিন নুবালা খ : ৭, পৃ. ৪৩)

আলোচিত বর্ণনাও তার ওই ভিত্তিহীন বর্ণনাগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সামনের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার হবে ইনশাআল্লাহ।

৭. ইবনে ইসহাক যেহেতু এই কথাটা ইবনে শিহাব থেকে সরাসরি শুনেছেন বলে উল্লেখ করেননি, অর্থাৎ ‘আমি ইবনে শিহাবকে বলতে শুনেছি’ বাক্য ব্যবহার না করে ‘ইবনে শিহাব বলেছেন’ ব্যবহার করেছেন তাই তার বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, ইতোপূর্বে বলা হয়েছে, তিনি ওই সব তাদলীসকারীর অন্তর্ভুক্ত যাদের প্রত্যক্ষ শ্রবণের উল্লেখবিহীন বর্ণনা সর্বসম্মতভাবে অগ্রহণযোগ্য।

রেওয়ায়েতের বিচার-বিশ্লেষণ সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে তারা যদি আযরাকীর ‘আখবারু মক্কা’ গ্রন্থের পৃ. ১৬৮-এর শেষ প্যারা এবং পৃ. ১৬৯-এর প্রথম প্যারাটুকুই মনোযোগ সহকারে লক্ষ করেন তবে তাদের বুঝতে বাকি থাকবে না যে, এই রেওয়ায়েতে ইবনে ইসহাক ও ইবনে শিহাবের মধ্যে ইয়াযীদ ইবনে ইয়ায ইবনে জু’দুবা বা এ ধরনের আরো কোনো মাতরূক-মুত্তাহাম (পরিত্যক্ত ও মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত) রাবী বিদ্যমান ছিল, যার নাম ইবনে ইসহাক তাদলীসের পন্থায় গোপন করেছেন। এই ইয়াযীদ এজন মাতরূক ও মুত্তাহাম রাবী। তিনি ইবনে ইসহাকের সমসাময়িক এবং দু’জনের আবাসও ছিল একই শহরে। [মীযানুল ই’তিদাল, শামসুদ্দীন যাহাবী (মৃত্যু : ৭৪৮ হি.) খ : ৪, পৃষ্ঠা ৪৩৬-৪৩৮; তারীখু বাগদাদ, খতীব বাগদাদী (মৃত্যু : ৪৬৩ হি.) খ : ১৪, পৃষ্ঠা ৩৩২ মাকতাবাতুল খানজী, কায়রো; আলকামিল ইবনে আদী (মৃত্যু : ৩৬৫ হি.) খ : ৭, পৃষ্ঠা : ২৬৪ তৃতীয় সংস্করণ ১৪০৯ হি.]

৮. তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ইবনে শিহাব এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আচ্ছা, ধরে নেওয়া হল তিনি তা বর্ণনা করেছেন! তখন প্রশ্ন হবে যে, তিনি কি মক্কাবিজয়ের সমসাময়িক? সবাই জানেন যে, মক্কাবিজয় ৮ম হিজরীতে সংঘটিত হয়েছে আর ইবনে শিহাব জন্মগ্রহণ করেছেন ৫০ হিজরীতে। তিনি রেওয়ায়েতের উপযু্ক্ত হতে হতে মক্কাবিজয়ের পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, ইবনে শিহাব এই তথ্য কার কাছ থেকে পেয়েছেন?

এখানে কেবলই শূন্যতা বিরাজ করছে। ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতি অনুযায়ী ইবনে শিহাব তা বর্ণনা করেছেন বলে ধরে নিলেও দেখা যাচ্ছে, তিনি এই তথ্যের কোনো সূত্র উল্লেখ করেননি। বিনাসূত্রে কেবল একটি দাবিমাত্র। এরপর সনদের অন্যান্য ত্রুটিগুলো তো রয়েছেই।

৯. নিবন্ধকার যদি মূল আরবী গ্রন্থের সহায়তা নিতে পারতেন তবে সম্ভবত তিনি সরাসরি আযরাকীর ওই কিতাবটা খুলে দেখতেন। সেক্ষেত্রে টীকাকার রূশদী ছালেহ সন্নিবেশিত দীর্ঘ টীকাও তার নজরে পড়ত। রূশদী ছালেহ পরিষ্কার ভাষায় আলোচনা করেছেন যে, আযরাকীর কোনো কোনো বর্ণনায় ঈসা আ. ও তাঁর জননীর ছবি না মোছার যে বিবরণ আছে তা প্রক্ষিপ্ত। সহীহ ও সঠিক বর্ণনাগুলোতে এই কথা নেই; বরং সকল ছবি মুছে ফেলার সুস্পষ্ট বিবরণ এসেছে। নিঃসন্দেহে আযরাকীর ওই বর্ণনা বাতিল ও মাতরূক (পরিত্যাক্ত ও ভিত্তিহীন)।

রুশদী ছালেহ লেখেন, প্রথমত ওই দুই ছবি আলাদা রাখার কোনো কারণ নেই।

দ্বিতীয়ত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো হারামকে বহাল রাখার আদেশ করা তো দূরের কথা, এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর শরীয়তে প্রাণীর ছবি সংরক্ষণ হারাম, যা অসংখ্য হাদীস শরীফদ্বারা প্রমাণিত।

তৃতীয়ত প্রক্ষিপ্ত অংশটি এ বিষয়ক অনেক সহীহ হাদীসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি এই বলে তার দীর্ঘ আলোচনার সমাপ্তি টেনেছেন যে, এই বিষয়গুলো অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রক্ষিপ্ত অংশটুকুর স্বরূপ প্রকাশ করে। (আখবারু মক্কা পৃষ্ঠা : ১৬৫-১৬৬ টীকা : ১, মাকতাবাতুছ ছাকাফা, অষ্টম সংস্করণ ১৪১৬ হি.)

বাইতুল্লাহকে চিত্র ও মূর্তি থেকে পবিত্র করার বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদক্ষেপ

এবার আমরা পাঠকবৃন্দের সামনে সহীহ হাদীস ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যাদির মাধ্যমে এই বিষয়টা পেশ করতে চাই যে, মক্কাবিজয়ের সময় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ ও তার চারপাশ থেকে কত গুরুত্বের সঙ্গে সকল ধরনের মূর্তি ও প্রাণীর প্রতিকৃতি অপসারণ করেছেন এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া কীভাবে সকল ছবি, মূর্তি ও ভাস্কর্য বিলুপ্ত করেছেন।

কা’বার বাইরে যে তিনশত ষাটটি মূর্তি স্থাপিত ছিল সেগুলোর ক্ষেত্রে তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই মু’জিযা প্রকাশ পেয়েছিল যে, তাঁর হাতের লাঠির শুধু ইশারার দ্বারাই সেগুলো ভূপাতিত হয়ে যাচ্ছিল। আর যে মূর্তিগুলো বিভিন্ন স্থানে রাখা ছিল তা তিনি বের করে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন। কা’বার বিভিন্ন স্তম্ভে এবং ভিতরের ও বাইরের দেয়ালে যত ছবি অঙ্কিত ও খোদিত ছিল সব মুছে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় একাধিক ব্যক্তিকে এই দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর আদেশে সকল চিত্র মুছে ফেলা হয় এবং এ সংবাদ জানানোর পর তিনি বাইতুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে খোদিত ছবিগুলো মুছে ফেলার পরও কিছু কিছু দৃষ্টিগোচর হচ্ছে দেখে পুনরায় ভালোভাবে মোছার আদেশ দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে ডলে ডলে সমান করার চেষ্টা করলেন। এরপরও যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেগুলোতে জাফরানের রং লাগিয়ে দিলেন। কিছু কিছু খোদিত চিত্রে মাটির লেপ দিয়ে জাফরানের রং লাগানো হল। এই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

এবার হাদীসগুলো লক্ষ করুন। সবগুলো হাদীসই মানের বিচারে ‘সহীহ’ বা ‘হাসান’ পর্যায়ে উন্নীত এবং সনদ মুত্তাছিল ও অবিচ্ছিন্ন।

১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন তখন বাইতুল্লাহর আশে পাশে তিনশ ষাটটি মূর্তি বিদ্যমান ছিল। তিনি প্রত্যেক মূর্তির দিকে হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করছিলেন এবং বলছিলেন:

جاء الحق وزهق الباطل، إن الباطل كان زهوقا، جاء الحق وما يبدئ الباطل وما يعيد.

সত্য এসেছে, মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। সত্য আগমন করেছে আর মিথ্যা না পারে কোনো কিছু সূচনা করতে, না পারে পুনরাবৃত্তি করতে। (সহীহ বুখারী হা. ২৪৭৮, ৪২৮৭, ৪৭২০; সহীহ মুসলিম হা. ১৭৮১)

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা.-এর বর্ণনায় এসেছে যে, লাঠির শুধু ইঙ্গিতের দ্বারাই মূর্তিগুলো ধরাশায়ী হচ্ছিল।

[সীরাতে ইবনে হিশাম খ : ৭, পৃষ্ঠা : ১১৪ (আররওযুল উনুফ-এর সঙ্গে মুদ্রিত সংস্করণ) তারীখুল ইসলাম শামসুদ্দীন যাহাবী খ : ২ পৃষ্ঠা : ৩১৮ ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতিতে, দি লাইফ অব মোহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুবাদে আলফ্রেড গিয়োম পৃ. ৫৫২]

এই কথাটা হযরত জাবির রা-এর হাদীসেরও এসেছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হাদীস : ৩৮০৬)

৩. আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন তখন বাইতুল্লাহ্য় মিথ্যা উপাস্যদের থাকা অবস্থায় তাতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তাঁর আদেশে ওই মূর্তি ও প্রতিকৃতিগুলো বের করা হল। এগুলোর মধ্যে ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-এরও প্রতিকৃতি ছিল। তাঁদের হাতে ছিল ভাগ্যনির্ধারণী শর! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ ওদের ধ্বংস করুন, তাদের জানা ছিল যে, এই দুইজন কখনও শর দ্বারা ভাগ্যগণনার চেষ্টা করেননি। (সহীহ বুখারী হা. ৪২৮৮,১৬১৯; সুনানে আবু দাউদ হা. ২০২০)

উল্লেখ্য যে, এই হাদীসে প্রতিকৃতিসমূহকে মিথ্যা উপাস্য বলা হয়েছে। ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-এর প্রতিকৃতি পূজার মূর্তি ছিল না।

দেয়ালে ও স্তম্ভে অঙ্কিত ছবি

৪. আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাইতুল্লাহতে বিভিন্ন প্রতিকৃতি দেখলেন তখন তাতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং সেগুলো বিলুপ্ত করার আদেশ দিলেন। তাঁর আদেশে সেগুলো মুছে দেওয়া হয়। (সহীহ বুখারী হা. ৩৩৫২; সহীহ ইবনে হিববান হা. ৫৮৬১)

৫. জাবির রা. থেকে বর্ণিত, মক্কাবিজয়ের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর ইবনুল খাত্তাব রা.কে আদেশ দিলেন, তিনি যেন কাবা ঘরের সব ছবি মুছে ফেলেন। সকল ছবি মোছার আগ পর্যন্ত তিনি কাবায় প্রবেশ করেননি। (সুনানে আবু দাউদ হা. ৪১৫৩; সহীহ ইবনে হিববান হা. ৫৮৫৭; তবাকাতে ইবনে সা’দ খ : ২, পৃষ্ঠা : ৩২০ আরো দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা খন্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ৪৭৯ হা. ৪/৩৮০৭৪)

যে ছবিগুলো মোছার পরও কিছু কিছু দেখা যাচ্ছিল তার উপরও তিনি আপত্তি করেছেন এবং ভালোভাবে মোছার কাজে নিজেও অংশগ্রহণ করেছেন।

৬. আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্য় প্রবেশ করে ইবরাহীম আ. ও মারইয়াম রা.-এর ছবি দেখলেন। তখন তিনি বললেন, এঁরা তো (যাদের চিত্র এই লোকেরা অঙ্কন করেছে) (আল্লাহর এই বিধান) শুনেছেন যে, ফেরেশতারা সে গৃহে প্রবেশ করেন না, যাতে কোনো চিত্র থাকে। (সহীহ বুখারী হা. ৩৩৫১;সহীহ ইবনে হিববান হা. ৫৮৫৮)

অর্থাৎ চিত্র সম্পর্কে এঁরা কখনও সম্মত থাকতে পারেন না। অথচ জাহেলরা তাঁদেরই প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। এই বর্ণনায় মারইয়াম রা.-এর প্রতিকৃতির উপরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপত্তি জানিয়েছেন। এরপরও তিনি তা বহাল রাখতে বলবেন?

৭. উসামা রা. বলেন, আমি কাবা ঘরের ভিতরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গেলাম। তখন কিছু চিত্র তার দৃষ্টিগোচর হল। তিনি এক বালতি পানি আনতে বললেন। আমি পানি উপস্থিত করলাম। তিনি তখন ছবিগুলো মুছতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন-

قاتل الله قوما يصورون ما لا يخلقون

‘আল্লাহ তাদের বিনাশ করুন যারা এমন কিছুর ছবি অঙ্কন করে যা তারা সৃষ্টি করতে পারে না।’

(মুসনাদে আবু দাউদ ত্বয়ালিসী পৃ. ৮৭; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হা. ৩৮০৬৫; শরহু মাআনিল আছার তহাবী খন্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩৮৩; আলআহাদীসুল মুখতারা, জিয়াউদ্দীন মাকদেসী-সূত্র : সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, নাসীরুদ্দীন আলবানী খ. ২, পৃ. ৭৩১; আনীসুস সারী ফী তাখরীজি আহাদীসি ফাতহিল বারী, নাবীল ইবনে মানসূর খ : ৪, পৃষ্ঠা : ৩০৬৮)

যে প্রতিকৃতিগুলো মোছার চেষ্টা সত্ত্বেও পুরোপুরি মোছা যায়নি তার উপর জাফরানের প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল।

৮. জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্য় প্রবেশ করে দুই রাকাত নামায পড়লেন। সেখানে ইবরাহীম আ., ইসমাঈল আ. ও ইসহাক আ.-এর প্রতিকৃতি দৃষ্টিগোচর হল। তারা ইবরাহীম আ.-এর হাতে ভাগ্যনির্ধারণী ‘শর’ স্থাপন করেছিল, যেন তিনি সেগুলোর দ্বারা ভাগ্য পরীক্ষা করছেন! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা ওই মূর্খদের বিনাশ করুন, ইবরাহীম আ. তো কখনও শর দ্বারা ভাগ্য পরীক্ষা করেননি!

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফরান আনতে বললেন এবং সেগুলোর উপর জাফরানের প্রলেপ দিয়ে দিলেন।

فلطخه بتلك التماثيل

(মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা হা. ৩৮০৬০; মুসনাদে ইবনে আবী শাইবা- আলমাতালিবুল আলিয়া ইবনে হাজার আসকালানী হাদীস : ৪৩০৩)

৯. একই বিবরণ মুসাফে ইবনে শাইবার বর্ণনাতেও এসেছে।

মুসাফে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাইবা রা.কে বললেন-

اكفني هذه

এই বিষয়টা সমাধা কর। কিন্তু কাজটা ছিল কঠিন। (কেননা, কিছু ছবি সহজে মোছা যাচ্ছিল না) একজন পরামর্শ দিলেন যে, এগুলোতে মাটির প্রলেপ দিয়ে উপরে জাফরানের রং লাগিয়ে দাও। পরে তাই করা হল। (তারীখুল ইসলাম, শামসুদ্দীন যাহাবী খন্ড : ২ পৃষ্ঠা : ৩১৯)

মোটকথা, হাদীস ও ইতিহাসের স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে অসংখ্য সূত্রে যেসব তথ্য এসেছে, নিবন্ধকার সেগুলো পরিত্যাগ করেছেন এবং আযরাকীর একটি কাহিনীগ্রন্থের ভিত্তিহীন বর্ণনা সীরাতে ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্তে কিছু ছবি বহাল রেখেছিলেন! বিষয়টা অত্যন্ত দুঃখজনক।

ধারণা করা যায় যে, ঈসা আ. ও তাঁর জননী মারইয়াম রা.-এর ছবি খোদিত ছিল, যা মাটি ও জাফরান দ্বারা লেপে দেওয়া হয়েছিল। কালক্রমে কোনো কোনো স্থান থেকে সেই প্রলেপ খসে পড়লে নীচের খোদিত ছবি প্রকাশিত হয়ে যায়। এই অবস্থাটা যাদের দৃষ্টি-গোচর হয়েছে তারা বর্ণনা করেছেন যে, বাইতুল্লাহর স্তম্ভে ঈসা আ. ও মারইয়াম রা.-এর ছবি দেখেছি। জিজ্ঞাসা করা হল, এখন সেগুলো কোথায়? উত্তরে বলেছেন, ৬৪ হিজরীর অগ্নিকান্ডে ভস্মিভূত হয়ে গেছে।

নিবন্ধকার সম্ভবত কোনো সূত্র থেকে এই বর্ণনাটা জেনেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছেন যে, এই ছবি ৬৮৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বাইতুল্লাহর শোভাবর্ধন করছিল এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও তা বাইতুল্লাহ্তে বিদ্যমান ছিল!

বলাবাহুল্য, এটা নিছক একটা কল্পনা। যে দু’একজন বলেছেন যে, আমরা বাইতুল্লায় অমুক অমুকের ছবি দেখেছি তারা একই সঙ্গে একথাও বলেছেন যে,

واراهما والطمس عليها

ওই ছবিগুলো যে মোছা হয়েছিল তা দেখা যাচ্ছিল। (আযরাকী পৃ. ১৬৮)

পরিষ্কার কথা যে, মাটি ও জাফরান লাগিয়ে বিলুপ্ত করার পর যখন কোনো কোনো স্থান থেকে তা খসে পড়েছিল তখন তা দৃষ্টিগোচর হয়। তাহলে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও এই ছবি ছিল, কিন্তু তা ছিল মাটি ও জাফরানের প্রলেপের নীচে।

এই হল প্রকৃত অবস্থা। কিন্তু একেই তারা বানিয়েছেন যে, এই ছবি-নাউযুবিল্লাহ-অমুক সন পর্যন্ত বাইতুল্লাহর শোভাবর্ধন করছিল!

বাইতুল্লাহ তো আল্লাহর ঘর, মসজিদ। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো নিজের ঘরেও ছবি রাখা বরদাশত করতেন না। সহীহ বুখারীতে (৫৯৫২) হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে-

لم يكن يترك في بيته شيئا فيه التصاليب إلا نقضه، وفي نسخة : تصاوير

‘তিনি তাঁর ঘরে ছবি অঙ্কিত কিছু দেখলে তা বিনষ্ট করে দিতেন।’

একবার মদীনাতে হযরত আলী রা. কে পাঠালেন যে, যেখানেই কোনো ছবি দেখবে তা মুছে দিবে। -সহীহ মুসলিম ৯৬৯

যিনি ঘরে-বাইরে কোথাও ছবি রাখার অনুমোদন দেননি; বরং তা মুছে ফেলার আদেশ করেছেন, তিনি বাইতুল্লাহতে কোনো ছবি, বিশেষত নারীর ছবি বহাল রাখতে বলবেন যেখানে শুধু ছবিই নয় পর্দাহীনতাও রয়েছে?

আয়েশা রা. বলেছেন, বাইয়াত গ্রহণের সময় তাঁর হাত কখনও কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি শুধু মৌখিক বাইয়াত নিতেন।

উম্মে আতিয়্যা রা. বলেছেন, এ মৌখিক বাইআত পর্দার আড়াল থেকে বা অন্য কারো মাধ্যমে নেওয়া হত। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৯১; সহীহ মুসলিম হা. ৪৯৭৯; ফাতহুল বারী ৮/৫০৫ দারুর রায়্যান, কায়রো, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৪০৭ হি.)

তো তাঁর সম্পর্কে এ মিথ্যাচার করা যে, সকল চিত্র মোছার আদেশ দিয়েও শুধু একজন নারীর ছবির উপর তিনি হাত রেখেছেন এবং না মোছার অনুরোধ করেছেন কতখানি ন্যক্কারজনক হতে পারে!

খোলাফায়ে রাশেদীন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। এটা তো হতেই পারে না যে, চিত্র সম্পর্কে তাঁর এই সকল সতর্কবাণী জানা সত্ত্বেও তারা এ বিষয়ে উদাসীনতার পরিচয় দিবেন।

মক্কা বিজয়ের সময়েরই আরেকটি ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহকে মুশরিকদের সকল নিদর্শন থেকে পবিত্র করার পর কিছুক্ষণ তাতে অবস্থান করে যখন বের হলেন তখন উছমান ইবনে তলহা (যাঁর কাছে কাবার চাবি ছিল) তাকে ডেকে বললেন, আমি তোমাকে ওই শিং দু’টি ঢেকে দেওয়ার আদেশ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি তা ভুলে গিয়েছি। সেগুলো ঢেকে দিও। ঘরে এমন কোনো বস্ত্ত থাকা উচিত নয়; যা নামাযীর মনোযোগ বিনষ্ট করে।

لا ينبغي أن يكون في البيت شيء يشغل المصلي

(সুনানে আবু দাউদ হা. ২০২৩; মুসনাদে আহমদ হা. ১৬৬৩৭; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক হা. ৯০৮৩; আসসুনানুল কুবরা বায়হাকী খ : ২, পৃষ্ঠা : ৪৩৮)

এই হাদীসটি সহীহ। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, শিং দু’টি ছিল ওই দুম্বার, যা ইসমাঈল আ.-এর বদলে হযরত ইবরাহীম আ. কুরবানী করেছিলেন।

শিং দুটো ঢেকে দেওয়ার আদেশ যিনি করছেন তিনি নারীর ছবি রেখে দিতে বলবেন?

সবশেষে বিনয়ের সঙ্গে একটি প্রশ্ন করতে চাই যে, আপনাদের ধারণায় যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চিত্র ও ভাস্কর্যের মধ্যে আপত্তির কিছু না থেকে থাকে তাহলে অন্য সব চিত্র মুছে ফেলার আদেশ কেন দেওয়া হল? সেগুলোও থাকত অন্তত মিল্লাতে ইবরাহীম-এর ইমাম হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রতিকৃতিটা অক্ষত থাকত, শুধু তার হাতে যে ভাগ্য-শর মূর্খেরা স্থাপন করেছিল সেটা বাদে?

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, একটি ভিত্তিহীন বর্ণনাকে তারা এভাবে অবলম্বন করছেন! যদি প্রকৃতপক্ষেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আদর্শ হয়ে থাকেন তবে তাঁর জীবনাদর্শ ভিত্তিহীন বর্ণনা থেকে নয়, বিশুদ্ধ ও সহীহ বর্ণনা থেকে গ্রহণ করা কর্তব্য। সকল সহীহ হাদীসের বক্তব্য এ বিষয়ে অভিন্ন যে, মক্কাবিজয়ের সময় বাইতুল্লাহর ভিতরে-বাইরে এবং চারপার্শ্বে না কোনো মূর্তি অবশিষ্ট রাখা হয়েছিল না কোনো চিত্র।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে চিত্র ও চিত্রকর

পাঠকবৃন্দ ওই সহীহ হাদীসগুলোর উপর একবার নজর বুলাতে পারেন যেগুলোতে চিত্র ও চিত্রকর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফয়সালা পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে।

১. হযরত আমর ইবনে আবাসা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রেরণ করেছেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার, মূর্তিসমূহ ভেঙ্গে ফেলার এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সঙ্গে অন্য কিছুকে শরীক না করার বিধান দিয়ে।’ (সহীহ মুসলিম হা. ৮৩২)

২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إن الذين يصنعون هذه الصور يعذبون يوم القيامة يقال لهم : أحيوا ما خلفتم.

‘যারা এই সব প্রতিকৃতি প্রস্ত্তত করে তাদেরকে কিয়ামতের দিন আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। তাদেরকে বলা হবে, যা তোমরা সৃষ্টি করেছিলে তাতে প্রাণ সঞ্চার কর।’ (সহীহ বুখারী হা. ৫৯৫১; সহীহ মুসলিম হা. ২১০৭)

৩. মুসলিম ইবনে সুবাইহ্ বলেন- ‘আমি মাসরূকের সঙ্গে একটি ঘরে ছিলাম যেখানে মারইয়াম রা.-এর প্রতিকৃতি ছিল। মাসরূক জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি কিসরার প্রতিকৃতি? আমি বললাম, না, এটি মারইয়াম রা.-এর প্রতিকৃতি। তখন মাসরুক বললেন-

سمعت عبد الله ابن مسعود يقول : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أشد الناس عذابا يوم القيامة المصورون.

আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে (রা.) বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রতিকৃতি প্রস্ত্ততকারীরা কেয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন আযাবের মুখোমুখি হবে। (সহীহ মুসলিম হা. ২১০৯)

৪. আবু যুরআ রাহ বলেন-

دخلت مع أبي هريرة في دار مروان، فرأى فيها التصاوير، فقال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : قال الله عز وجل : ومن أظلم ممن ذهب يخلق خلقا كخلقي فليخلقوا ذرة، وليخلقوا حبة، أو ليخلقوا شعيرة.

আমি আবু হুরায়রা রা.-এর সঙ্গে মারওয়ানের গৃহে প্রবেশ করলাম। সেখানে কিছু চিত্র তাঁর দৃষ্টিগোচর হল। তিনি তখন বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেন-

ومن أظلم ممن ذهب يخلق خلقا كخلقي

ওই লোকের চেয়ে বড় জালেম আর কে যে আমার সৃষ্টির মতো কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চায়। (তাদের যদি সামর্থ্য থাকে তবে) সৃষ্টি করুক একটি কণা, একটি শষ্য কিংবা একটি যব! (সহীহ মুসলিম হা. ২১১১; সহীহ বুখারী হা. ৫৯৫৩)

৫. হযরত আবু তলহা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا تدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا تصاوير

‘ওই গৃহে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না যাতে কুকুর বা ছবি রয়েছে।’ (সহীহ বুখারী ৫৯৪৯; সহীহ মুসলিম হা. ২১০৬)

৬. হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا تدخل الملائكة بيتا فيه تماثيل أو تصاوير

‘ফেরেশতারা ওই ঘরে প্রবেশ করেন না যাতে মূর্তি বা ছবি রয়েছে।’ (সহীহ মুসলিম ২১১২)

৭. আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন-

سمعت محمدا صلى الله عليه وسلم يقول : من صور صورة في الدنيا كلف يوم القيامة أن ينفخ الروح وليس بنافخ.

আমি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, যে কেউ দুনিয়াতে কোনো প্রতিকৃতি তৈরি করবে তাকে কিয়ামতের দিন বাধ্য করা হবে যেন সে তাতে প্রাণ সঞ্চার করে, অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না। (সহীহ বুখারী হা. ৫৯৬৩; সহীহ মুসলিম হা. ২১১০)

৮. সায়ীদ ইবনে আবুল হাসান রাহ. বলেন-

كنت عند ابن عباس إذ جاءه رجل، فقال : يا ابن عباس! إني رجل إنما معيشتي من صنعة يدي، وإني أصنع هذه التصاوير، فقال ابن عباس : لا أحدثك إلا ما سمعت من رسول الله صلى الله عليه وسلم، سمعته يقول : من صور صورة فإن الله معذبه حتى ينفخ فيه الروح، وليس بنافخ فيه أبدا، فربا الرجل ربوة شديدة وأصفر وجهه، فقال : ويحك، إن أبيت إلا أن تصنع فعليك بهذا الشجر، كل شيء ليس فيه روح.

আমি (হযরত আব্দুল্লাহ) ইবনে আববাস রা.-এর কাছে বসা ছিলাম। ইতিমধ্যে একজন লোক এসে তাঁকে বলল, হে ইবনে আববাস, আমি একজন হস্তশিল্পী, হাতে তৈরি প্রতিকৃতির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করি। (এই পেশা কি বৈধ?) হযরত ইবনে আববাস রা. বললেন, আমি শুধু তোমাকে সে কথাই বলব, যা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে শুনেছি। আমি তাকে বলতে শুনেছি, ‘যে কেউ কোনো প্রতিকৃতি তৈরি করে আল্লাহ তাআলা তাকে আযাব দিবেন যে পর্যন্ত না সে তাতে প্রাণ দান করে, অথচ সে প্রাণ দান করতে পারবে না।’ একথা শুনে সে অস্থির হয়ে পড়ল এবং তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তখন হযরত ইবনে আববাস রা. বললেন, ‘প্রতিকৃতিই যদি তৈরি করতে হয় তবে প্রাণহীন বস্ত্তর প্রতিকৃতি তৈরি করবে। (সহীহ বুখারী হা. ২২২৫)

৯. হযরত আবু জুহাইফা রা. বলেন-

إن النبي صلى الله عليه وسلم نهى عن ثمن الدم، وثمن الكلب، وكسب البغي، ولعن آكل الربا وموكله، والواشمة والمستوشمة والمصور.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন রক্তের মূল্য, কুকুরের মূল্য এবং ব্যভিচারের দ্বারা উপার্জিত অর্থ। আর লানত করেছেন সূদ ভক্ষণকারী ও সূদ প্রদানকারীর উপর, উল্কি অঙ্কনকারী ও উল্কি গ্রহণকারীর উপর এবং প্রতিকৃতি প্রস্ত্ততকারীর উপর। (সহীহ বুখারী হা. ৫৯৬২)

১০. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন-

قدم رسول الله عليه وسلم من سفر، وقد سترت سهوة لي بقرام فيه تماثيل، فلما رأه رسول الله صلى الله عليه وسلم هتكه، وقال : أشد الناس عذابا يوم القيامة الذين يضاهون بخلق الله، قالت : فقطعناه فجعلناه وسادة أو وسادتين.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফর থেকে ফিরলেন। আমি কক্ষের দ্বারে একটি পর্দা ঝুলিয়ে ছিলাম, যাতে ছবি অঙ্কিত ছিল। তিনি তা খুলে ফেললেন এবং বললেন, কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিন আযাব দেওয়া হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টি বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।’ উম্মুল মু’মিনীন বলেন, তখন আমরা তা কেটে ফেললাম এবং একটি বা দুইটি বালিশ বানালাম। (সহীহ বুখারী হা. ৫৯৫৪; সহীহ মুসলিম হা. ২১০৭)

১১. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন-

وعد جبريل النبي صلى الله عليه وسلم، فراث عليه، حتى أشد على النبي صلى الله عليه وسلم، فخرج النبي صلى الله عليه وسلم، فلقيه، فشكا إليه ما وجد، فقال : إنا لا ندخل بيتا فيه صورة ولا كلب.

একবার হযরত জিব্রীল আ. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু আসছিলেন না। এতে নবীজীর কষ্ট হচ্ছিল। তিনি তখন বাইরে বের হলেন এবং জিব্রীল আ.এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পেয়েছেন বলে অভিযোগ করলেন। তখন জিব্রীল আ. বললেন, আমরা এমন ঘরে প্রবেশ করি না, যাতে কোনো চিত্র থাকে বা কুকুর থাকে। (সহীহ বুখারী হা. ৫৯৬০)

১২. আবুল হাইয়াজ আসাদী রাহ. বলেন, হযরত আলী ইবনে আবু তালেব আমাকে বললেন-

ألا أبعثك على ما بعثني عليه ورسول الله صلى الله عليه وسلم؟ أن لا تدع صورة إلا طمستها، ولا قبرا مشرفا إلا سويته.

আমি কি তোমাকে এখন কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে কাজের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? (তা এই যে,) তুমি সকল প্রাণীর মূর্তি বিলুপ্ত করবে এবং সকল সমাধি-সৌধ ভূমিসাৎ করে দিবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে …এবং সকল চিত্র মুছে ফেলবে। (সহীহ মুসলিম হা. ৯৬৯)

১৩. আলী ইবনে আবী তালেব রা. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন বললেন-

أيكم ينطلق إلى المدينة فلا يدع بها وثنا إلا كسره ولا قبرا إلا سواه، ولا صورة إلا لطخها.

তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে মদীনায় যাবে এবং যেখানেই কোনো মূর্তি পাবে তা ভেঙ্গে ফেলবে, যেখানেই কোনো সমাধি-সৌধ পাবে তা ভূমিসাৎ করে দিবে এবং যেখানেই কোনো চিত্র পাবে তা মুছে দিবে?

আলী রা. এই দায়িত্ব পালন করলেন। ফিরে আসার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

من عاد لصنعة شيء من هذا فقد كفر بما أنزل على محمد.

‘যে কেউ পুনরায় ওই সব বস্ত্ত তৈরি করবে সে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) প্রতি নাযিলকৃত দ্বীনকে অস্বীকারকারী। (মুসনাদে আহমদ হা.৬৫৯)

১৪. আবু হুরায়রা রা. বলেন-

استأذن جبريل عليه السلام على النبي صلى الله عليه وسلم فقال : كيف أدخل وفي بيتك ستر فيه تصاوير، فإما أن تقطع رؤوسها أو تجعل بساطا يوطأ، فإنا معشر الملائكة لا تدخل بيتا في تصاوير.

একদিন জিব্রীল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসার অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভিতরে আসুন। জিব্রীল আ. বললেন, কীভাবে আসব, আপনার গৃহে ছবিযুক্ত পর্দা রয়েছে। আপনি হয়তো এই ছবিগুলোর মাথা কেটে ফেলুন কিংবা তা বিছানায় ব্যবহার করুন, যা পদদলিত হবে। কেননা, আমরা ফেরেশতারা ওই গৃহে প্রবেশ করি না যাতে ছবি থাকে।’ (সুনানে নাসায়ী হা. ৫৩৬৫; সহীহ ইবনে হিববান ৫৮৫৩)

১৫. উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতার সময় তাঁর জনৈকা স্ত্রী একটি গির্জার কথা উল্লেখ করলেন। গির্জাটির নাম ছিল মারিয়া। উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা ইতোপূর্বে হাবাশায় গিয়েছিলেন। তাঁরা গির্জাটির কারুকাজ ও তাতে বিদ্যমান প্রতিকৃতিসমূহের কথা আলোচনা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শয্যা থেকে মাথা তুলে বললেন-

أولئك إذا مات منهم الرجل الصالح بنوا على قبره مسجدا ثم صوروا فيه تلك الصورة، أولئك شرار الخلق عند الله.

‘তাদের কোনো পুণ্যবান লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর ইবাদতখানা নির্মাণ করত এবং তাতে প্রতিকৃতি স্থাপন করত। এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকৃষ্টতম সৃষ্টি। (সহীহ বুখারী হা. ১৩৪১; সহীহ মুসলিম হা. ৫২৮)

এই হাদীস থেকে জানা যাচ্ছে যে, প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ পূর্বের শরীয়তেও হারাম ছিল। তা না হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে আল্লাহর নিকৃষ্ট সৃষ্টি বলে আখ্যায়িত করতেন না।

বাইবেলে এখনও পর্যন্ত প্রাণীর প্রতিকৃতি তৈরির অবৈধতা বিদ্যমান রয়েছে। বলা হয়েছে :

`Do not make for yourselves images of anything in heaven or on earth or in the water under the earth.’ (HOLY BIBLE (Good news Bible) p. 80, The Bible society of India)

মোটকথা, প্রাণীর প্রতিকৃতি প্রস্ত্তত করা এবং এর মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার দুটোই শরীয়তে নিষিদ্ধ ও হারাম। এ প্রসঙ্গে যে হাদীসগুলো এসেছে তা অকাট্য ও মুতাওয়াতির। ইসলামের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য ও ইজমা রয়েছে। এটা মু’মিনদের ঐকমত্যপূর্ণ পথ। আর কুরআন মজীদে মু’মিনদের ঐকমত্যপূর্ণ পথ পরিহার করাকে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ বলা হয়েছে। (সূরা নিসা : ১৫)

প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণের অবৈধতা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধান। এতে পূজার শর্ত নেই। এই অবৈধতার কারণ হল আল্লাহর সৃষ্টিগুণের সঙ্গে সাদৃশ্য গ্রহণ, যা বিভিন্ন হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

আমরা আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যেই আমাদেরকে অবস্থান করতে হবে। আল্লাহ তাআলা প্রাণীর আকৃতি দানকে একমাত্র তাঁরই অধিকার সাব্যস্ত করেছেন। কেননা আকৃতির মধ্যে শুধু তিনিই প্রাণ দান করতে পারেন। যার পক্ষে প্রাণ দান সম্ভব নয়, তাকে আল্লাহ আকৃতি নির্মাণেরও অনুমতি দেন না। একে তিনি তাঁর সঙ্গে মোকাবিলা করার সমার্থক বলে মনে করেন।

তবে মানুষের স্বভাবে অঙ্কন ও নির্মাণের যে প্রেরণা রয়েছে তার জন্য আল্লাহ তাআলা জড়বস্ত্ত বা প্রাণহীন বস্ত্তর চিত্র-প্রতিকৃতি প্রস্ত্ততের অনুমতি দিয়েছেন।

উপরের আলোচনা থেকে প্রাণীর প্রতিকৃতি সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফয়সালা ও পদক্ষেপ আমরা জেনেছি। তদ্রূপ মক্কা-বিজয়ের সময় সব ধরনের চিত্র ও মূর্তি সরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও তাঁর বিভিন্ন পদক্ষেপ উপরে আলোচিত হয়েছে। এরপরও কি চিন্তা করা যায় যে, তিনি বাইতুল্লাহ্তে কোনো ছবি রাখার অনুমতি দিবেন, উপরন্তু একজন নারীর ছবি?

দুই.

নিবন্ধকারের দ্বিতীয় বক্তব্য এই-

‘‘আমরা সবাই জানি, হজরত আয়েশা (রা.) নয় বছর বয়সে নবীজীর (সা.) সহধর্মিনী হন। তিনি পুতুল নিয়ে খেলতেন। নবীজীর তাতে কোনো আপত্তি ছিল না, বরং তিনিও মজা পেতেন এবং কৌতুহল প্রদর্শন করতেন। (মুহাম্মদ আলী আল-সাবুনী, রাওয়াইউল বয়ন, ২য় খ , পৃষ্ঠা ৪১৩)’’’

এই হাদীসটি সহীহ। এখানে ‘রাওয়াইউল বয়ানের’ উদ্ধৃতি না দিয়ে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের উদ্ধৃতি দেওয়া উচিত ছিল।

তবে হাদীসটি আলোচ্য বিষয়ে আপ্রাসঙ্গিক। এটা এসেছে মেয়েদের খেলনা সম্পর্কে। এখান থেকে মূর্তি ও ভাস্কর্যের বৈধতা আহরণের প্রয়াস কি অপরিণত চিন্তার প্রমাণ বহন করে না?

চিন্তাশীল মানুষ আলোচ্য বিষয়ের বিধান উম্মুল মু’মিনীন-এর ওই হাদীস থেকে আহরণ করবেন যেখানে তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফর থেকে ফিরলেন। আমি দরজায় একটি ঝালর বিশিষ্ট পর্দা ঝুলিয়ে ছিলাম, যাতে পাখাওয়ালা ঘোড়ার ছবি অঙ্কিত ছিল। তিনি তা খুলে ফেলার আদেশ দিলেন। আমি তা খুলে ফেললাম। (সহীহ মুসলিম হা. ২১০৭)

আম্মাজান যখন ছোট ছিলেন তখন পাখাওয়ালা ঘোড়ার পুতুল ছিল তার খেলার সামগ্রী। এর উপর নবীজী আপত্তি করেননি, কিন্তু যখন তিনি বড় হলেন এবং ঘোড়ার ছবিযুক্ত পর্দা ব্যবহার করলেন তখন নবীজী তা খুলে ফেলার আদেশ দিয়েছেন এবং তাকে সতর্ক করেছেন। এ সম্পর্কিত কিছু হাদীস ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি।

রাওয়াইউল বয়ানের পূর্ণ বয়ান কি লক্ষ করা হয়েছে

মক্কা মুকাররমার ‘কুল্লিায়াতুশ শরীয়া ওয়াদ দিরাসাতিল ইসলামিয়া’র উস্তাদ শায়খ মুহাম্মাদ আলী আসসাবূনীর কিতাব ‘রাওয়াইউল বয়ান ফী তাফসীরি আয়াতিল আহকাম মিনাল কুরআন’-এর উদ্ধৃতিতে ছোট মেয়েদের খেলনা বিষয়ক উপরোক্ত হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ওই গ্রন্থেই প্রতিকৃতি সম্পর্কে যে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে তা কেন নিবন্ধকারের দৃষ্টিগোচর হল না তা আমাদের বোধগম্য নয়। গ্রন্থকার সেখানে চিত্র ও মূর্তি সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। এক স্থানে তিনি পরিস্কার ভাষায় লেখেন-

‘ইসলাম তাওহীদের ধর্ম এবং সে শিরকের প্রতিপক্ষ। শিরকের চেয়ে বড় গুনাহ ইসলামে নেই। এজন্য সে পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজার উপর প্রবলভাবে আক্রমণ করেছে। আর হাদীস শরীফ চিত্র ও চিত্রকরদের সম্পর্কে মৃত্যুর পয়গাম নিয়ে এসেছে। চিত্র ও প্রতিকৃতির ঘৃণ্যতা ও তা সংরক্ষণের নিষিদ্ধতা ঘোষণা করেছে। ইসলামে চিত্র ও মূর্তির নিষিদ্ধতা সম্পর্কে দ্বিধা-সংশয়ের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।’ (রাওয়াইউল বয়ান, খ : ১ পৃ. ৪০৬)

এরপর তিনি যে শিরোনাম দিয়েছেন তা হল-

الأدلة القاطعة على تحريم التصوير

‘যে দলীলগুলো অকাট্যভাবে চিত্র অঙ্কনের অবৈধতা প্রমাণ করে।’

এই শিরোনামের অধীনে শুধু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম থেকেই আটটি হাদীস উল্লেখ করে মন্তব্য করেন :

هذه النصوص، وأمثالها كثيرة، تدل دلالة قاطعة على حرمة التصوير، وكل من درس الإسلام علم علم اليقين أن النبي صلى الله عليه وسلم حرم التصوير، واقتناء الصور وبيعها، وكان يحطم ما يجده منها …

‘উপরোক্ত হাদীসগুলো এবং এর সমার্থক আরো অনেক হাদীস সুস্পষ্টভাবে প্রতিকৃতি তৈরির অবৈধতা প্রমাণ করে। ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনা আছে এমন প্রত্যেকেই সন্দেহাতীতভাবে জানেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিত্র অঙ্কন, চিত্র সংরক্ষণ এবং চিত্র বিক্রি সবই নিষিদ্ধ ও হারাম করেছেন। তিনি এগুলো পেলে বিনষ্ট করে দিতেন।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ৪০৮)

পরবর্তী শিরোনাম-

العلمة في تحريم التصوير

চিত্র অঙ্কন অবৈধ ঘোষণার কারণ

এখানে তার আলোচনার সারকথা এই যে, চিত্র ও মূর্তি হারাম হওয়ার কারণ হল সৃষ্টিবৈশিষ্ট্যে স্রষ্টার সাদৃশ্য গ্রহণ। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে এই কারণ উল্লেখিত হয়েছে।

তদ্রূপ পৌত্তলিকতার প্রতিভূ মূর্তিকে পরিহার করা এবং আক্বীদা-বিশ্বাসকে শিরক ও মূর্তিপূজার মিশ্রণ থেকে মুক্ত রাখার উদ্দেশ্যও এই বিধানের পিছনে কার্যকর। কেননা অতীত জাতিসমূহে এ পথেই মূর্তিপূজার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। (প্রাগুক্ত পৃ. ৪০৯-৪১০)

গ্রন্থকার বৈধ ও অবৈধ দুই ধরনের চিত্র ও প্রতিকৃতির কথা আলোচনা করেছেন। অবৈধ প্রতিকৃতির মধ্যে চার ধরনের বস্ত্ত উল্লেখিত হয়েছে : ১. কোনো মানুষ বা প্রাণীর মূর্তি। ২. হাতে অঙ্কিত প্রাণীর চিত্র। ৩. প্রাণীর পূর্ণ ছবি। ৪. কোনো প্রকাশ্য স্থানে স্থাপিত কিংবা কোথাও ঝোলানো ছবি।

প্রত্যেকটির সঙ্গে বুখারী মুসলিম থেকে হাদীস শরীফ উল্লেখ করেছেন। (প্রাগুক্ত পৃ. ৪১১-৪১২)

বৈধ প্রতিকৃতির মধ্যে উল্লেখিত হয়েছে তিন ধরনের বস্ত্ত : ১. জড়বস্ত্ত, বৃক্ষলতা, নদী-সাগর, প্রাকৃতিক দৃশ্য ইত্যাদি প্রাণহীন বিষয়। ২. বিচ্ছিন্ন কোনো অঙ্গ যেমন শুধু হাত, চোখ, পা ইত্যাদি। ৩. ছোট মেয়েদের খেলার পুতুল। (প্রাগুক্ত পৃ. ৪১২-৪১৩)

যেহেতু নিবন্ধকার ‘রাওয়াইউল বয়ান’-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন তাই আশা করা যায়, এই প্রমাণসিদ্ধ আলোচনাও তিনি গ্রহণ করবেন।

তিন.

নিবন্ধকারের তৃতীয় কথাটি এই-

‘‘৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হজরত ওমর (রা.) জেরুজালেম জয় করেন। প্রাণীর ছবিসহ একটি ধুপদানি তার হাতে আসে। তিনি সেটি মসজিদ-ই-নববীতে ব্যবহারের জন্য আদেশ দেন। (আব্দুল বাছির, ‘ইসলাম ও ভাস্কর্য শিল্প :বিরোধ ও সমন্বয়’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা অনুষদ পত্রিকা, জুলাই ২০০৫-জুন ২০০৬।)’’

আব্দুল বাছীর সাহেবের ওই প্রবন্ধ আমরা পড়েছি। সেখানে ধুপদানির গল্পের কোনো উদ্ধৃতি নেই। তাহলে ওই প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দেওয়া কি অর্থহীন হয়ে গেল না? আর প্রাবন্ধিকের অবস্থা তো এই যে, অনেক সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি হাদীস ও ফিকহ অস্বীকারের প্রবণতাকে গোপন রাখতে পারেননি। যাইহোক, আমাদের জানা মতে এ বর্ণনার মূলসূত্র একটিই। সেখান থেকেই পরের লোকেরা বর্ণনা করে থাকেন। সেটা হচ্ছে ইয়াহইয়া ইবনুল হুসাইন-এর ‘আখবারুল মাদীনা।’ কিন্তু ওই গ্রন্থে বর্ণনাটির একটিমাত্র সনদ (সূত্র) রয়েছে, যে সনদের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ‘আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আম্মার।’ এর সম্পর্কে জরহ-তা’দীলের ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন ‘লাইছা বিশাই’ বলে রায় দিয়েছেন। অর্থাৎ এই রাবী মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। না তার মধ্যে সততা আছে, আর না তার স্মৃতিশক্তি ভালো। ইয়াহিয়া ইবনে মায়ীন রাহ.-এর এই সিদ্ধান্ত ‘কিতাবুল জরহি ওয়াত তাদীল’ ইবনে আবী হাতিম (খন্ড : ৫ পৃ. ১৫৭) এবং সুয়ালাতুদ দারিমী তে (পৃ. ১৬৯ দারুল মামূন লিত তুবাছ, দামেস্ক ১৪০০ হি.) সনদের সঙ্গে উল্লেখিত হয়েছে।

হযরত উমর রা.এর যুগে মসজিদে নববীতে ছবিযুক্ত ধুপদানি ব্যবহত হওয়া এবং খলীফা মাহদীর যুগে তা বিনষ্ট হওয়া-এই দুটো বিষয়ই ওই পরিত্যক্ত রাবীর বর্ণনা। তাহলে এই বর্ণনা এবং এর দ্বারা প্রমাণ দান দুটোই যে পরিত্যক্ত হবে তা তো বলাই বাহুল্য।

দ্বিতীয় কথা এই যে, ছবিযুক্ত ধুপদানি ব্যবহার আর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশিষ্ট কারো ভাস্কর্য স্থাপন, দুটো কি এক কথা হল?

সর্বশেষ প্রশ্ন এই যে, হযরত উমর রা.-এর যে ঘটনা সহীহ ও মুত্তাছিল সনদে বর্ণিত হয়েছে এবং নবুওতের রুচি ও আদর্শ ও নবী-আদর্শে প্রতিষ্ঠিত খিলাফতেরও রুচি-প্রকৃতির সঙ্গে পূর্ণ সাযুজ্যপূর্ণ সেটা প্রকাশ করতে কী অসুবিধা ছিল?

আসলাম (হযরত উমর রা.-এর আযাদকৃত গোলাম ও তাঁর একান্ত সহচর) বলেন, উমর রা. যখন শামে আগমন করলেন তখন খ্রিষ্টানদের কতিপয় ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে তাঁকে নিমন্ত্রণ করল। হযরত উমর রা. একথা বলে অপারগতা প্রকাশ করলেন যে-

إنا لا ندخل كنائسكم من أجل الصور التي فيها، يعني التماثيل.

তোমাদের গির্জাগুলোতে বিভিন্ন মূর্তি রয়েছে। এজন্য আমরা তাতে প্রবেশ করিব না। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক খন্ড : ১০, পৃ. ৩৯৮; হা. ১৯৪৮৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হা. ২৫৭০৬, ৩৪৫৩৮)

চার.

নিবন্ধকারের চতুর্থ কথাটি এই-

‘‘পারস্যের কবি শেখ সাদীকে কি পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু আছে? উনি হচ্ছেন সেই মানুষ যার ‘নাত’ এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা মিলাদে সব সময় পাঠ করে থাকেন।

‘বালাগাল উলা বি কামালিহি,

কাশাফাদ্দুজা বি জামালিহি …

মাদ্রাসার ‘উত্তেজিত বালকেরা’ শুনলে হয়তো মন খারাপ করবে যে, শেখ সাদীর মাজারের সামনেই তার একটি মর্মর পাথরের ভাস্কর্য আছে। সেখানকার মাদ্রাসার ছাত্ররা তা ভাঙেনি।

ইসলামের দুজন মহান সুফিসাধক, যাঁদের বাস ছিল পারস্যে (বর্তমান ইরান) এঁদের একজনের নাম জালালুদ্দীন রুমী। অন্যজন ফরিদ উদ্দীন আত্তার (নিশাপুর)। তাঁর মাজারের সামনেও তাঁর আবক্ষ মূর্তি আছে। (বরফ ও বিপ্লবের দেশে, ড. আবদুস সবুর খান, সহকারী অধ্যাপক, ফার্সী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।)’’

এই কথাগুলো যে আলোচ্য বিষয়ে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন এই যে, সাদী, রূমী ও আত্তার কি নিজেদের ভাষ্কর্য নির্মাণ করিয়েছেন? কিংবা তাদের পূর্বসূরীদের কারো ভাস্কর্য তৈরি করিয়েছিলেন। মূর্খ লোকেরা তো তাদের উপাস্যদের ও বরেণ্য ব্যক্তিদেরই ভাস্কর্য তৈরি করে থাকে। কিন্তু চিন্তাশীল মানুষ এ প্রসঙ্গে কোন বিষয়টা বিবেচনা করবেন-কে ভাস্কর্য নির্মাণ করল, না কার ভাস্কর্য নির্মাণ করা হল? জাহেলী যুগে মক্কার মুশরিকরা তো ইবরাহীম আ. ও ইসমাইল আ.-এরও প্রতিকৃতি প্রস্ত্তত করেছিল। এতে কি এই দাবি করা যায় যে, প্রতিকৃতি নির্মাণ হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাইল আ.-এর নীতি ছিল?!

যদি বরেণ্য ব্যক্তিদের কর্ম ও সিদ্ধান্তের দ্বারাই দাবি প্রমাণ করতে হয় তাহলে ইতিহাস থেকে দেখাতে হবে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম, আইম্মায়ে তাবেয়ীন, আইম্মায়ে তাবে তাবেয়ীন এবং পরবর্তী মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে কেউ কারো কোনো ভাস্কর্য নির্মাণ করিয়েছেন। বলা বাহুল্য যে, এটা প্রমাণ করা অসম্ভব। এই অপারগতার কারণেই কি সাদী ও সাদীর ভাস্কর্যকে এক করে ফেলা হল?

ভাস্কর্য নির্মাণে ইরানীরা খুব অগ্রসর। সেখানে শীয়া মতবাদের অনুসারীরাই সংখ্যগরিষ্ঠ। ইসলামের সঙ্গে শীয়া সম্প্রদায়ের (ইছনা আশারিয়া ও ইসমাইলিয়্যা) যে সম্পর্ক তা সচেতন মানুষের অগোচরে নয়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখুন, খোদ শীয়াদেরও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাদিতে প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ এবং তার মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (দেখুন : ‘ফুরূউল কাফী’ ও ‘মান লা ইয়াহযুরুহুল ফকীহ’ ইত্যাদি)

পাঁচ.

নিবন্ধের শেষের দিকে লালন শাহ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ‘তার জীবনের সাধনাই ছিল আল্লাহর অনুসন্ধান।’

ওই সাধনার স্বরূপ ও পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না। সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলি যে, সে ‘সাধনা’ শালীন ও ভদ্রোচিত এবং পরিচ্ছন্ন ও বাস্তবসম্মত কোনো বিষয় ছিল না।

আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রশ্ন যদি আসে তবে তার একমাত্র পথ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ। বলাবাহুল্য, লালনশাহ এই পথের পথিক ছিলেন না।

তার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে নিবন্ধকারের ‘আল্লাহর অনুসন্ধান’ শব্দ দুটির উপর বলতে চাই যে, যারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করেছিলেন তাদের কারো ভাস্কর্য তৈরি করাও কি ইসলামসম্মত? এক্ষেত্রে তো মূলনীতি এটাই যে, যে যত বড় ব্যক্তিত্ব তার ভাস্কর্য নির্মাণ ততই ক্ষতি ও ভ্রষ্টতার কারণ।

ছয়.

অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় এই যে, তিনি মূর্তিস্থাপন প্রতিরোধের মতো একটি ইসলামী কাজের প্রতিবাদ করছেন। প্রতিবাদ কি ভালো কাজের করা হয় না মন্দ কাজের? সত্য ও ন্যায়ের সামনে শির নত করাই ঈমান ও ভদ্রতার দাবি। সারা দেশে কত অশ্লীল ও গর্হিত কার্যকলাপ হচ্ছে সেসব বিষয়ে নিবন্ধকার কখনো প্রতিবাদের প্রয়োজন বোধ করেননি। এখন ভাস্কর্য প্রতিরোধের মতো একটি ঈমানী কাজের প্রতিবাদ করা তার কাছে খুব প্রয়োজনীয় হয়ে গেল!

সাত.

প্রবন্ধকার লিখেছেন-

‘‘বাংলাদেশে তো অনেক বড় বড় ইসলামি পন্ডিত আছেন। তাঁরা কেন চুপ করে আছেন? তাঁরা কেন পূজার মূর্তি এবং ভাস্কর্যের ব্যাপারটা বুঝিয়ে সবাইকে বলছেন না?’’

আমার জানা নেই ‘ইসলামী পন্ডিত’ বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন। উলামায়ে কেরাম তো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, পূজার মূর্তি দুই কারণে নিষিদ্ধ : ১. প্রাণীর প্রতিকৃতি। ২. পূজা, আর সাধারণ ভাস্কর্য প্রাণীর প্রতিকৃতি হওয়ার কারণে অবৈধ।

পূজা শুধু মূর্তিরই হয়নি, বিভিন্ন বস্ত্তরও হয়েছে। সেগুলোর ভাস্কর্য তৈরি করাও নিষিদ্ধ ও হারাম। এটা পূজার কারণে। যদিও তা প্রাণীর প্রতিকৃতি নয়।

তদ্রূপ ছবি বা মূর্তির পিছনে কখনো শুধু সৌন্দর্যই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। এটা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ প্রাণীর প্রতিকৃতি। আবার কখনো স্মরণ ও সম্মানের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। এটা যেমন প্রাণীর প্রতিকৃতি হওয়ার কারণে হারাম তেমনি এ কারণেও যে, এভাবে কোনো প্রতিকৃতির সম্মান দেখানো এক ধরনের ইবাদত বলেই গণ্য।

আধুনিক বুদ্ধিজীবী মহল যেসব ইসলামী পন্ডিতের প্রতি প্রসন্ন, ড. ইউসুফ কারযাভী তাদের অন্যতম। অনেকটা তাঁরই সমশ্রেণীয় আরেকজন পন্ডিত মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আলহাজারী। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ এদের হয়েছিল। নিবন্ধকারের অনুরোধক্রমে ভাস্কর্য সম্পর্কে তাঁদের সিদ্ধান্তও উল্লেখ করছি।

১. তিউনিসের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক আলাপচারিতায়, যেখানে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন, ভাস্কর্য সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান হাজাবী (১২৯১ হি.-১৩৭৬ হি.) বলেছেন, ‘ইসলামী শরীয়তে এটা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। এখানে বিশিষ্ট ও কীর্তিমান ব্যক্তিদের স্মৃতিরক্ষার প্রশ্ন যদি আসে তবে সে জন্য ভাস্কর্য নির্মাণই একমাত্র পন্থা নয়। আমরা তাদের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে পারি। তদ্রূপ ইতিহাসের পাতায় তাদের কর্ম ও অবদান সংরক্ষিত থাকবে। এভাবে অধিকতর উত্তম ও ফলপ্রসূ পন্থায় তাদের স্মৃতিরক্ষা হতে পারে।

আসলে সব বিষয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধঅনুসরণ সভ্যতা নয়। বরং নিন্দনীয়। আমরা তাদের ওই অংশটুকু গ্রহণ করব যা আমাদের জন্য উপযোগী। আর যা আমাদের জন্য উপযোগী নয় তা আমরা পরিত্যাগ করব। এটা অপরিহার্য নয় যে, তাদের সকল বিষয় আমাদের জন্য উপযোগী হবে কিংবা তাদের কাছে যা কিছু নিন্দিত তা বাস্তবেও নিন্দনীয় হবে। সর্বাবস্থায় আমাদেরকে শরীয়তের সীমারেখার ভিতরেই অবস্থান করতে হবে। শরীয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় আমরা গ্রহণ করতে পারি না।’’

(আলফিকরুস সামী খ : ২, পৃষ্ঠা : ৪২৩-৪২৫ আলমাকতাবাতুল ইলমিয়্যা, মদীনা মুনাওরা, ১৩৯৭ হি.)

২. ড. ইউসুফ কারযাভী বলেন, ‘ইসলামে মূর্তি ও ভাস্কর্য অবৈধ।’

এই বিধানগত দিক ছাড়াও ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও চেতনার সঙ্গে মূর্তি ও ভাস্কর্যের বিরোধ সম্পর্কে প্রমাণসিদ্ধ আলোচনা করেন। সারসংক্ষেপ তুলে দিচ্ছি :

ক. ইসলামে প্রাণীর প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ হওয়ার অন্যতম তাৎপর্য হল, মুসলমানের চিন্তা-চেতনা এবং মন-মানসকে শিরকের কলুষ থেকে পবিত্র রাখা। তাওহীদের বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত সংবেদনশীল। এবং এটা অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। কেননা, অতীত জাতিসমূহে মূর্তির পথেই শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।

খ. কোনো কোনো ভাস্কর তার নির্মিত বস্ত্তর ব্যাপারে এতই মুগ্ধতার শিকার হয়ে যায় যে, যেন ওই প্রস্তরমূর্তি এখনই জীবন্ত হয়ে উঠবে! এখনই তার মুখে বাক্যের স্ফূরণ ঘটবে! বলাবাহুল্য, এই মুগ্ধতা ও আচ্ছন্নতা তাকে এক অলীক বোধের শিকার করে দেয়। যেন সে মাটি দিয়ে একটি জীবন্ত প্রাণী সৃষ্টি করে ফেলেছে! এজন্যই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-‘যারা এইসব প্রতিকৃতি প্রস্ত্তত করে তাদেরকে কিয়ামতের দিন আযাব দেওয়া হবে। তাদেরকে বলা হবে, ‘যা তোমরা সৃষ্টি করেছিলে তাতে প্রাণসঞ্চার কর।’

গ. আরো দেখা যায় যে, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কোনো সীমারেখার পরোয়া করে না। নগ্ন ও অর্ধনগ্ন নারীমূর্তি, মূর্তিপূজার বিভিন্ন চিত্র ও নিদর্শন ইত্যাদি সবকিছুই নির্মিত হতে থাকে।

ঘ. তদুপরি এগুলো হচ্ছে অপচয় ও বিলাসিতার পরিচয়-চিহ্ন। বিলাসী লোকেরা বিভিন্ন উপাদানে নির্মিত প্রতিকৃতিসমূহের মাধ্যমে তাদের কক্ষ, অট্টালিকা ইত্যাদির ‘সৌন্দর্য বর্ধন’ করে থাকে। ইসলামের সঙ্গে এই অপচয় ও বিলাসিতার কোনো সম্পর্ক নেই।

কীর্তিমানদের স্মৃতিরক্ষার প্রশ্নে ইসলামী আদর্শ এবং অনৈসলামিক পদ্ধতি সম্পর্কে তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ যত বড়ই হোক না কেন তার প্রকৃত অবস্থা থেকে তাকে উন্নীত করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দিত। স্বয়ং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজের সম্পর্কেও সাবধান করে বলেছেন, ‘তোমরা আমার এমন অবাস্তব প্রশংসা করো না যেমন খৃষ্টানরা ঈসা ইবনে মারইয়াম সম্পর্কে করেছে। তোমরা আমার সম্পর্কে বলবে, আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।’ (সহীহ বুখারী)

শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যাপারে যে দ্বীনের আদর্শ এই সে কখনও কোনো মানুষের সম্মানে মূর্তির মতো স্মারকস্তম্ভ নির্মাণে সম্মত হতে পারে না, যার পিছনে অজস্র অর্থ ব্যয় করা হবে, যার প্রতি ভক্তি ও সম্মানের সঙ্গে লোকেরা অঙুলি নির্দেশ করবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে অমরত্ব লাভ হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে। এই অমরত্বই মুমিনের লক্ষ্য। আর যেসব ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যেও স্মৃতিরক্ষার প্রয়োজন হয় সেখানে তার উপাদান ইট-পাথরের ভাস্কর্য নয়; বরং হৃদয়ের ভালোবাসা, কর্ম ও কীর্তির সশ্রদ্ধ আলোচনা এবং চিন্তা ও চেতনায় আদর্শ অনুসরণের প্রেরণাই হল অমরত্বের উপাদান।

আল্লাহর নবী ও তার খলীফাগণের এবং ইসলামের মহান পূর্বসূরীদের অমর স্মৃতি পাথরের ভাস্কর্যের দ্বারা সংরক্ষিত হয়নি। তা হয়েছে প্রজন্ম পরম্পরায় মানুষের হৃদয়ে এবং তাদের কর্ম ও অবদানের সুরভিত আলোচনায়। এটা হল ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। অন্যদিকে ভাস্কর্যভিত্তিক স্মৃতিরক্ষার পদ্ধতি হচ্ছে অত্যন্ত স্থূল ও পশ্চাৎপদ চিন্তার ফসল। এ প্রসঙ্গে তিনি উস্তাদ মুহাম্মদ মুবারক-এর একটি দীর্ঘ উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। শেষ কথাগুলো এখানে হুবহু তুলে দিচ্ছি,

‘‘মূর্তি ও ভাস্কর্যের মতো স্থূল উপকরণের মাধ্যমে স্মৃতিরক্ষার প্রয়াস প্রকৃতপক্ষে পশ্চাৎপদতা। প্রাচীন গ্রীক, পারস্য সভ্যতায় এটা বিদ্যমান ছিল। পরে ইউরোপীয়রা তা অনুসরণ করেছে। এরা স্বভাবগতভাবেই ছিল মূর্তির পূজারী। তাদের পক্ষে মানুষের প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ণ করা সম্ভব হয়নি। ত্যাগ ও বীরত্বের সমুন্নত দৃষ্টান্তরূপে মানুষের সম্ভাবনাকে অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি বলেই তারা তাদের বীর পুরুষদেরকে উপাস্য হিসেবে এবং উপাস্যদেরকে বীর যোদ্ধা হিসেবে কল্পনা করেছে।’’ (আলহালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম পৃ. ৯০-৯৪, মাকতাবা ওয়াহবা, কায়রো চতুর্বিংশ সংস্করণ ১৪২১ হি.)

মূর্তি ও ভাস্কর্যের পারস্পরিক যোগসূত্র

আগেও বলেছি যে, ইসলামে প্রাণীর প্রতিকৃতির অবৈধতা একটি স্বতন্ত্র বিধান। পূজার উদ্দেশ্য থাকুক বা না থাকুক প্রাণীর মূর্তি তৈরি করাই অবৈধ। প্রাণীর প্রতিকৃতি হওয়াই অবৈধতার কারণ। এজন্য ভাস্কর্যের বিধানগত দিক বোঝার জন্য মূর্তি ও ভাস্কর্যের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা অপরিহার্য নয়। বাইতুল্লাহ্ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে পূজার মূর্তি সরিয়েছেন তেমনি স্তম্ভ ও দেয়ালে অঙ্কিত চিত্রগুলোও মুছে দিয়েছেন। তিনি সেগুলোর উপর এই বলে আপত্তি করেননি যে, এগুলোর পূজা করা হয়; বরং তিনি বলেছেন-

قاتل الله قوما يصورون ما لا يخلقون

‘আল্লাহ ওই গোষ্ঠীকে ধ্বংস করুন যারা এমন প্রতিকৃতি নির্মাণ করে যা তারা সৃষ্টি করে না।’

আরো বলেছেন-

لا تدخل المائكة بيتا فيه تصاوير

‘ফেরেশতাগণ ওই গৃহে প্রবেশ করেন না যাতে রয়েছে প্রতিকৃতি।’

আম্মাজান আয়েশা রা.-এর কক্ষে ঝোলানো পর্দা তিনি এই বলে খুলে দেননি যে, এই চিত্রগুলো পূজার সামগ্রী; বরং তিনি বলেছেন-

أشد الناس عذابا يوم القيامة الذين يضاهون بخلق الله.

‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিক আযাবে ওইসব লোক পতিত হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টিবৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।’

আরো বলেছেন-

إن أصحاب هذه الصور يعذبون يوم القيامة يقال لهم أحيوا ما خلقتم.

এই প্রতিকৃতি প্রস্ত্ততকারীদেরকে কিয়ামতের দিন আযাব দেওয়া হবে, তাদেরকে বলা হবে, যা তোমরা ‘সৃষ্টি’ করেছিলে তাতে প্রাণ সঞ্চার কর।’

মোটকথা, মূর্তি এজন্যই অবৈধ যে, তা প্রাণীর প্রতিকৃতি। ওই মূর্তির পূজা করা না হলেও এবং পূজিত কোনো কিছুর মূর্তি না হলেও তা অবৈধ।

কিন্তু প্রশ্ন এই যে, এ প্রসঙ্গে মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে কোনো যোগসূত্রই নেই বলে তারা যে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন-তা কি সঠিক?

এ প্রসঙ্গে আমি শুধু দুইটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করতে চাই।

১. নিবন্ধকার আবদুল বাছির সাহেবের প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ওই প্রবন্ধের প্রথম কটি লাইন এখানে তুলে দিচ্ছি।

‘মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে ভাস্কর্য নির্মাণ ও চিত্রশিল্পের ধারা চলে এসেছে। আলকুরআন ও হাদীসের ভাষ্য অনুসারে হযরত আদম আ. এবং হযরত নূহ আ.-এর মাঝামাঝি সময়ের প্রজন্মের লোকেরা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।’ (কলা অনুষদ পত্রিকা জুলাই ২০০৫-জুন ২০০৬)

এখানে তিনি যে উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন তা হচ্ছে : মুফতী মুহাম্মাদ শফী, তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, অনুবাদ ও সম্পাদনা মাওলানা মহিউদ্দীন খান, রিয়াদ ১৪১৩ হি., পৃ. ১৪০৮)

তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনের উদ্ধৃত অংশটুকু হুবহু তুলে দিচ্ছি :

ইমাম বগভী বর্ণনা করেন, এই পাঁচ জন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার নেক ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দা ছিলেন। তাদের সময়কাল ছিল হযরত আদম ও নূহ আ.-এর আমলের মাঝামাঝি। তাঁদের অনেক ভক্ত ও অনুসারী ছিল। তাঁদের ওফাতের পর ভক্তরা সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আল্লাহ তাআলার এবাদত ও বিধি-বিধানের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখে। কিছুদিন পর শয়তান তাদেরকে এই বলে প্ররোচিত করল : তোমরা যেসব মহাপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে উপাসনা কর, যদি তাদের মূর্তি তৈরি করে সামনে রেখে লও, তবে তোমাদের উপাসনা পূর্ণতা লাভ করবে এবং বিনয় ও একাগ্রতা অর্জিত হবে। তারা শয়তানের ধোঁকা বুঝতে না পেরে মহাপুরুষদের প্রতিকৃতি তৈরি করে উপাসনালয়ে স্থাপন করল এবং তাদের স্মৃতি জাগরিত করে এবাদতে বিশেষ পুলক অনুভব করতে লাগল। এমতাবস্থায়ই তাদের সবাই একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেল এবং সম্পূর্ণ নতুন এক বংশধর তাদের স্থলাভিষিক্ত হল। এবার শয়তান এসে তাদেরকে বোঝাল : তোমাদের পূর্বপুরুষদের খোদা ও উপাস্য মূর্তিই ছিল। তারা এই মূর্তিগুলোরই উপাসনা করত। এখান থেকে প্রতিমাপূজার সূচনা হয়ে গেল।’’ (সংক্ষিপ্ত মাআরিফুল কুরআন পৃ. ১৪০৮)

তাহলে দেখা যাচ্ছে, স্মারক মূর্তি থেকেই পূজার মূর্তির সূচনা।

২. বাংলা পিডিয়ায় ভাস্কর্যের যে প্রবন্ধটি রয়েছে তার সারকথাই হল, এই শিল্পের সূচনা ও বিকাশ পুরোটাই ঘটেছে মূর্তিকে কেন্দ্র করে। বিখ্যাত ও প্রাচীন সকল ভাস্কর্যই বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। কিছু উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি :

ক. ‘এই শিল্পের কেন্দ্র ছিল মথুরা। এখানে সে সময় ব্রাক্ষণ, বৌদ্ধ ও জৈন মূলত এই প্রধান তিনটি কেন্দ্রের অনুসারীরা পূজার নিমিত্তে মূর্তি বানাতে গিয়ে এর সূচনা করেছিল।’ (বাংলা পিডিয়া প্রকাশনায় : বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রথম প্রকাশ : চৈত্র ১৪০৯/মার্চ ২০০৩, খ : ৭, পৃষ্ঠা : ৩৩৩)

খ.‘গুপ্ত শাসকগণ ছিলেন একনিষ্ঠ বৈষ্ণব। প্রাথমিক গুপ্তমূর্তিগুলোর বেশির ভাগই বিষ্ণু অথবা বিষ্ণু সংশ্লিষ্ট অন্য যে কোন মূর্তি। এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যটি বিহারের ভাগলপুরের শাহকুন্ড থেকে আবিষ্কৃত নরসিংহ মূর্তি।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩৪)

গ. ‘বাংলার গুপ্ত ভাস্কর্যগুলো বেশির ভাগই প্রতীকী এবং এগুলির আকৃতি নির্ধারিত হয়েছে মধ্যদেশ বা মধ্যভারতের পুরোহিত কর্তৃক বর্ণিত দেবতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩৫)

ঘ. ‘অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং এ ধর্মের মহাযান মতবাদটি তাদের উদার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

‘পাল ভাস্কর্যের সর্বপ্রাচীন নমুনাটি ধর্মপালের ২৬ রাজ্যাঙ্কের (আনুমানিক ৭৭৫-৮১০ খৃ.) যা বিহারের গয়া থেকে পাওয়া গেছে। দেবপালের সময়ের তারিখ সম্বলিত বলরামের দুটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ও তারার একটি প্রস্তর ভাস্কর্য এ অঞ্চল থেকেই পাওয়া গেছে।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৭-৩৩৮)

ঙ. ‘বাংলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দশম শতকে যে সকল ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে বৌদ্ধ মূর্তির সঙ্গে অনেক ব্রাক্ষণ্যমূর্তিও অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ হিসেবে প্রতীকী চিহ্ন সম্বলিত বেশ কিছু মনসা মূর্তির কথা বলা যায়, যেগুলি এ অঞ্চলের প্রথম পর্যায়ের ভাস্কর্য হিসেবে পরিচিত।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩৯)

চ. ‘পশ্চিম দিনাজপুরের এহনাইল থেকে প্রাপ্ত লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগল মূর্তিটি (২৪.৪ সেমি) তাদের কমনীয় আলিঙ্গনভঙ্গির জন্য শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য হিসেবে প্রতীয়মান।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩৯)

এধরনের আরো অনেক উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে।

বাংলা পিডিয়ায় ‘মূর্তিতত্ত্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি :

ক. ‘মহাজাগতিক বা পঞ্চবোধিসত্ত্ব বাংলায় পৃথকভাবে পূজিত হতেন। মান্দার (নওগাঁ জেলা) ভারসন থেকে প্রাপ্ত ও বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত মস্তকবিহীন কালো পাথরে খোদিত ধ্যানীবুদ্ধ অক্ষোভ্যের এ অনিন্দ্যসুন্দর ভাস্কর্যটি পঞ্চবোধিসত্ত্ব ভাস্কর্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’ (প্রাগুক্ত খ : ৮, পৃ. ৩১৪)

জৈন ধর্মীয় মূর্তি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নিবন্ধকার বলেন,

খ. শুধু বর্ধমানেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ও বাকুড়া জেলাগুলিতে প্রচূর সংখ্যক পাথরের জৈন ভাস্কর্য ও অন্যান্য পুরাবস্ত্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলির মধ্যে কিছু কিছু এখনও সেখানে পূজিত হচ্ছে, আবার কিছু কিছু জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। (প্রাগুক্ত পৃ. ৩১৮)

মোটকথা, ভাস্কর্য থেকে মূর্তি এবং মূর্তি থেকে ভাস্কর্য-এই চলাচলই হল মূর্তি ও ভাস্কর্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সারকথা। একে অস্বীকার করা বাস্তবতাকেই অস্বীকার করার নামান্তর। এ প্রসঙ্গে দৈনিক আমার দেশ-(১/১১/০৮ঈ.) এ প্রকাশিত জনাব ফাহমীদুর রহমানের প্রবন্ধটি পাঠকবৃন্দ পড়ে নিতে পারেন।

আট.

প্রবন্ধের শেষদিকে তিনি লেখেন-

‘‘এই বিশ্বব্রক্ষান্ডে মানুষের মতো বুদ্ধিমান কোনো প্রাণীর সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্রক্ষান্ডের তুলনায় অতি তুচ্ছ এই প্রাণী নিজের মেধায় সৃষ্টিরহস্যের সমাধানের দিকে এগুচ্ছে। তার পরিচয় সে রেখে যাচ্ছে কাব্যে, সাহিত্যে, সংগীতে, শিল্পকলায়। মাত্র সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার এই প্রাণী তার দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে সমগ্র বিশ্বব্রক্ষান্ডে। মানুষের সৃষ্টির প্রতি সম্মান দেখানো মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতিই সম্মান দেখানো। কারণ সব সৃষ্টির মূলে তিনি বাস করেন।’’

এ প্রসঙ্গে শুধু এটুকুই আরজ করব যে, সৃষ্টিরহস্যের প্রকৃত সমাধান হল স্রষ্টার পরিচয় লাভ করা। এটা ওই সব চিন্তাশীল মানুষের সামনে প্রতিভাত হয়েছে যাদের সম্পর্কে কুরআন মজীদের ইরশাদ-

الَّذِیْنَ یَذْكُرُوْنَ اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوْدًا وَّ عَلٰی جُنُوْبِهِمْ وَ یَتَفَكَّرُوْنَ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ۚ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًا ۚ سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ۝۱۹۱

‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে (তারা বলে) পরওয়ার দেগার এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই। আমাদেরকে তুমি দোযখের শাস্তি থেকে রক্ষা কর। (সূরা আলে ইমরান : ১৯১)

আরো ইরশাদ হয়েছে-

۠۝۲۶ اَلَمْ تَرَ اَنَّ اللّٰهَ اَنْزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً ۚ فَاَخْرَجْنَا بِهٖ ثَمَرٰتٍ مُّخْتَلِفًا اَلْوَانُهَا ؕ وَ مِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌۢ بِیْضٌ وَّ حُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ اَلْوَانُهَا وَ غَرَابِیْبُ سُوْدٌ۝۲۷ وَ مِنَ النَّاسِ وَ الدَّوَآبِّ وَ الْاَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ اَلْوَانُهٗ كَذٰلِكَ ؕ اِنَّمَا یَخْشَی اللّٰهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمٰٓؤُا ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیْزٌ غَفُوْرٌ۝۲۸

তুমি কি দেখনি, আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, অতঃপর তার দ্বারা বিভিন্ন বর্ণের ফলমূল উদগত করি। পর্বতসমূহের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের-সাদা, লাল ও নিকষ কালো। তদ্রূপ রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের মানুষ, জন্তু, চতুষ্পদ প্রাণী। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়। (সূরা : ফাতির ২৭-২৮)

বলাবাহুল্য যে, এঁরা আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অনুগত হয়ে থাকেন। আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় উপনীত হন না।

সর্বশেষ দরখাস্ত এই যে, সৃষ্টি ও আবিষ্কার এক জিনিস নয়। তদ্রূপ কোনো কিছু যিনি আবিষ্কার করেছেন তিনি আবিষ্কারক, স্রষ্টা নন। স্রষ্টা তিনি যিনি তার সৃষ্টিকে মেধা ও চিন্তাশক্তি দান করেছেন এবং বাক্য ও কলম দ্বারা ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা দিয়েছেন। সূত্র: আল-কাউসার

-এএ

আপনার বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন- 01640523566