202159

ফুলের রাজ্য গদখালী: অপার সম্ভবনার এক রঙ্গিন অধ্যায়

শাহীন আলম।।
যশোর থেকে

‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো হে অনুরাগী!’ কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের চমৎকা এ কবিতাটি কেউ পড়তে পারেন আবার নাও পড়তে পারেন। কিন্তু ফুল ভালোবাসেন না এমন মানুষ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া ভার। চাঁদ না থাকলে যেমন রাতের আকাশ মলিন, তেমনি ফুল ছাড়া পৃথিবীটা ধূসর পাণ্ডুলিপি । তাইতো ফুল যেখানেই ফোটে সেখানেই সুন্দর; হোক সেটা গোবরে ফোঁটা পদ্মফুল, ঝোপঝাড়ের বুনোফুল, বর্ষায় ভেজা কদম, শিশির ভেজা ঘাসফুল কিংবা শিউলী ফুলের সৌরভ অথবা কবিতার খাতা।

প্রকৃতিকে সুন্দর করা, মনের খোরাক জোগানো, সাহিত্য-সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি এই ফুলই এখন হয়ে উঠেছে যশোরের গদখালী এলাকার মানুষের জীবিকা সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম। যশোর সদর থেকে যশোর-বেনাপোল হাইওয়ে ধরে সোজা ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ঝিকরগাছা উপজেলার একটি ইউনিয়ন নাম গদখালী। এই হাইওয়ের দুপাশ ধরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাড়িয়ে শতবছরে পুরোনো হাজারো বৃক্ষ। যা দেশের সীমানা পেরিয়ে চলে গেছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অর্থাৎ কোলকাতা পর্যন্ত।

দেশের মানুষের কাছে ফুলের জন্য গদখালী বিখ্যাত হলেও মূলত ফুলের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে গদখালী ইউনিয়নের পানিসারা গ্রাম। এই গ্রামের একজন বাসিন্দা নাম তার শের আলী সরদার। তিনি ১৯৮২ সনে এক ভারতীয় লোকের পরামর্শে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে কিছু গোলাপ আর রজনীগন্ধা ফুলের বীজ সংগ্রহ করে আনেন এবং নিজের একখণ্ড জমিতে চাষ শুরু করেন। কেইবা জানত তার এই চাষাবাদ পদ্ধতি একদিন বাণিজ্যিক ‍রূপ লাভ করবে,জীবিকা নির্বাহের পথ সৃষ্টি করবে লাখো মানুষের। আর গদখালীর বুকে ছুটে আসবে হাজার হাজার দর্শনার্থী।

আশির দশকে মূলত এখানে ফুলচাষ শুরু হলেও তা বাণিজ্যিকভাবে চাষ হতে সময় লেগেছে আরও বেশ সময়। বলতে গেলে সেটা শুরু হয় ২০০৫ সালের পর থেকে। দেশের বাজারে ফুলের ব্যাপক চাহিদা এবং ফুল চাষ ও ফুলের ব্যবসা লাভ জনক হওয়ায় ২০১০ সালের পর থেকে একচেটিয়াভাবে এ অঞ্চলের কৃষকেরা ফুলচাষে মননিবেশ করে। আর চলতি দশকের মধ্যে একমাত্র ফুল চাষেই পাল্টেগেছে গদখালী তথা পানিসারা ও আশেপাশের গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মান ও আর্থিক অবস্থা। যার সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে গোটা গদখালী এলাকাবাসী এমনকি ঝিকরগাছা উপজেলার ওপর। অথচ ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত এই গদখালী এলাকার মানুষের প্রধান ফসল ছিল ধান,পাট,আলু আর সবজি বিশেষ করে পেপে চাষ। বর্তমানে ধান চাষ কিছুটা থাকলেও বাকি ফসলের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে ফুল।

No description available.

আওয়ার ইসলামের এক বিশেষ জরিপে দেখা গেছে গদখালী এলাকায় চাষাবাদের জন্য পাঁচ কাঠা জমি আছে এমন কৃষক তার তিনকাঠা জমিতেই ফুল চাষ করে আর এলাকার শতকরা ৯৮ ভাগ কৃষকই ফুলচাষের সঙ্গে জড়িত। আর ঝিকরগাছা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মাহবুব আলম রনি ‘আওয়ার ইসলাম২৪’ কে জানান গদখালীর ফুল চাষীদের কাছ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঝিকরগাছা ও পাশ্ববর্তী শার্শা উপজেলার মোট ৭৫ টি গ্রামে সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৫-৬ হাজার কৃষক সরাসরি ফুল উৎপাদন করছে।

বর্তমানে গদখালীতে চাষ হওয়া প্রধান ফুলগুলো হলো গোলাপ,গ্লাডিওলাস,রজনীগন্ধা,গাধা, জারবেরা ইত্যাদি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ এর দেওয়া তথ্যমতে বর্তমানে গদখালীতে ২৭২ হেক্টর জমিতে গ্লাডিওলাস, ১৬৫ হেক্টর জমিতে রজনীগন্ধা, ২২ হেক্টর জমিতে জারবেরা, ১০৫ হেক্টর জমিতে গোলাম এবং ৫৫ হেক্টর জমিতে গাধা এবং ৬ হেক্টর জমিতে অন্যান্য ফুল চাষ হয়। ঝিকরগাছা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে গদখালীতে দৈনিক ৪৫-৫৫ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করা হয় যার মাসিক হিসাবে দাড়ায় ৪-৫ কোটি এবং বার্ষিক হিসাবে যা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

তবে এ বছর গদখালীর ফুলচাষীদের সব থেকে খারাপ সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছি যা অতীতে কখনও হয়নি। করোনাকালীন দেশে লকডাউন এবং আম্ফান ঝড়ে ফুলচাষীদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। একে তো লকডাউনে ফুলের কোন রকম বেঁচাবিক্রি ছিল না তারপর ঘূর্ণি ঝড় আম্ফানে লণ্ডভণ্ড করে দেয় লক্ষ টাকার খরচ করে বানানো ফুলের শেডগুলো। ফুলের জন্য বিশেষ হিমাগার ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষেতেই পঁচে নষ্ট হয়েগেছে কোটি কোটি টাকার ফুল, পরিণত হয়েছিল গবাদি পশুর খাদ্যে।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোস্যাটির সভাপতি আব্দুর রহিম আওয়ার ইসলাম২৪ কে জানান, এইবছরের মার্চ মাস থেকে পরবর্তী ৫ মাসে অর্থাৎ লকডাউন সময়টাতে গদখালীর ফুল চাষী ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছিল ৪৫০ কোটি।

সারা বছরই দেশের বাজারে ফুলের টুকটাক চাহিদা থাকলেও সবথেকে বেশি চাহিদার সৃষ্টি হয় মূলত দেশের জাতীয় দিবস ও অনুষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে যেমন স্বাধীনতা দিবস, ২১শে ফেব্রুয়ারি,১লা বৈশাখ, ভালোবাসা দিবস, ঈদ এবং পূজা-পার্বনকে কেন্দ্র করে। এময় ফুলের দাম স্বাভাবিকের তুলনায় ৪-৫ গুণ বেশি বেড়ে যায়।

No description available.

এই যখন গদখালীর ফুলচাষীদের সার্বিক তথ্য উপাত্ত তাহলে আসলে পরিবর্তন তা কোথায়? কীভাবে ভাবেই বা বদলে যাচ্ছে এলাকাবাসীর ভাগ্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে আমাদের ফিরে যেতে আরও বছর পাঁচেক আগে৷ গদখালীর ফুলচাষের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত পানিসারার মোড় নামে পরিচিত এ জায়গাটি প্রমান করে এই এলাকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটুকু কাজ করছে এই ফুল চাষ। অতীতে এই স্থানে শুধুমাত্র একটা টং দোকান ছাড়া কিছুই ছিল না। অথচ আজ সেখানে খাবার হোটেল, চা-,কফির দোকান, রেস্টুরেন্ট, ফুলের দোকান ও ছোটবড় অনেক নার্সারি যেখান থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে অনেক পরিবার।

পানিসারা থেকে গদখালী বাজার তিন কিলোমিটার যেখানে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হয় ফুলের বাজার আর শেষ হয়ে যায় সকাল ৮ টার মধ্যে। মূলত এ বাজার থেকে ফুল ব্যবসায়ীরা সরাসরি ফুলচাষীদের কাছ থেকে ফুল ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করেন। গদখালীর অঞ্চলের ফুলচাষী তথা ফুলপরিবহনের কথা চিন্তা করে USAID- আমেরিকার জনগণের পক্ষ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাকা করে দেওয়া হয়েছে। কৃষক ও সাধারণ মানুষের আরও উন্নত যোগাযোগ প্রদানের উদ্দেশ্য বসানো হয়েছে রবি ৪জি নেটওয়ার্ক টাওয়ার।

অতীতে স্কুল কলেজ থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকার তাগিদে প্রবাসে পাড়ি জমাত তারা এখন ফুলচাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে খুজে পেয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের পথ।

ইতোমধ্যে গদখালীর নাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশ এবং দেশের বাইরে, রীতিমতো পরিনত হয়েছে যশোর জেলার অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান হিসেবে। স্থানীয় মানুষের তথ্যমতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন প্রায় গড়ে ২০০-৩০০ জন দর্শনার্থীর আগমন ঘটে এ এলাকায় যা শীতের মৌসুমে আরও বেশি হয়।

অপার সম্ভাবনাময় এই গদখালীর ফুলচাষ এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভবিষ্যতে অনেক অবদান রাখবে এই আশায় ইতোমধ্যে সরকারী ও বেসরকারিভাবে অনেক প্রকল্প ও উন্নয়নকর্মসূচী হাতে নেওয়া হয়েছে। ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মাহবুব আলম রনির দেওয়া তথ্য অনুসারে গদখালীর ফুলচাষীদের কথা মাথায় রেখে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যে কর্মসূচীগুলো হাত নেওয়া হয়েছিল তারমধ্য উল্লেখ্যযোগ্য হলো United States Agency International Development (USAID) আমেরিকার জনগণের পক্ষে এ এলাকায় পাকা রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নির্মাণ যা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এ অঞ্চলের ফুলচাষী ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ দিনের ইচ্ছা কোল্ডস্টোর নির্মাণ যার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েগেছে।

No description available.

আশা করা হচ্ছে এই কোল্ডস্টোরটি বাস্তবায়ন হলে কৃষকরা তাদের ফুল,ফুলে বীজ, আলু ও অন্যান্য সবজি হিমাগার করতে রাখতে পারবে এবং ফসলের পচন বা নষ্ট হয়ে যাওয়া রোধ করা যাবে। একই সঙ্গে বাড়বে শতশত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ যা সার্বিকভাবে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অগ্রনি ভূমিকা পালন করবে । এছাড়াও ‘বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন’ এর মাধ্যমে ঝিকরগাছা উপজেলায় ফুল ও সবজি উৎপাদন সম্প্রাসারণে ড্রিপ ইরিগেশন কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে সৌরচালিত ডাগওয়েল,পলি হাউজ, ট্রিপ ইরিগেশন, ফ্লাওয়ার শেডন এবং সোলার পাম্প স্থাপন। যার ফলে কৃষকরা এখন খুব সহজেই সেচের ব্যবস্থা করতে পারে আর সব কিছু সৌর চালিত হওয়ায় আর্থিক দিকটাও অনেক সাশ্রয় করা যায়।

ফুল ও সবজির যৌথচাষাবাদ, ফুল এবং ফুলের বীজ সংরক্ষণ ও গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয় মাথায় অতিশীঘ্রই গদখালীতে ফুল গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে জানান তিনি। এতে করে ফুল প্যাকেজিং, প্রসেসিং অনেক সহজ হবে এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার।

বসন্ত বাতাসে অন্যের বাড়ির ফুলের গন্ধ আপনার বাসায় আসতেও পারে আবার নাও আসতে পারে কিন্তু গদখালীর বসন্ত আপনাকে হতাশ করবে না। বাংলাদেশের বুকে গদখালী ফুলের একটা স্বর্গীয় স্থান। এ যেন চির বসন্ত চির যৌবনা। রাস্তায় দাড়িয়ে সামনে পিছনে ডানে-বামে যে দিকে তাকানো হবে শুধু ফুল আর ফুল। ফুলে ফুলে শিহরিত হয়ে উঠবে আপনার শরীর, সে ফুলের গন্ধে কম্পন সৃষ্টি করবে আপনার হৃদয়ে। মূলত ডিসেম্বর,জানুয়ারি,ফেব্রুয়ারি এই তিন মাসে এখানে সব থেকে বেশি ফুল উৎপাদন হয়। তাই দর্শনার্থীরা ফুল উপভোগ করার জন্য এই সময়টা সবথেকে বেশি পছন্দ করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বিভিন্ন স্কুল,কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজারো দর্শনার্থী ভিড় জমায় এখানে আর তাদেরকে উদ্দেশ্য তৈরি হচ্ছে হোটেল রেস্টুরেন্টে এবং গেস্ট হাউজ। আর স্থানীয় ফুল চাষী ও ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে প্রতিবছর জানুয়ারিতে গদখালীর ফুলের মেলা হিসেবে পালন করা হয়।

-কেএল

আপনার বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন- 01640523566