199330

মুরুব্বিদের অসম্মান হয় এমন কিছু স্যোশাল মিডিয়ায় না বলি

মোস্তফা ওয়াদুদ>
সাম্প্রতিক সময়ে স্যোশাল মিডিয়ায় বড় আলেমদের বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয়েছে। সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। এতে ব্যক্তিগত বিষয় থেকে শুরু করে ঘরে-বাইরের অনেক অপ্রকাশিত বিষয়ও উঠে এসেছে। যা মোটেও কাম্য নয়।

এর দ্বারা পরস্পরের মাঝে যেভাবে বিদ্ধেষ তৈরি হচ্ছে। সেভাবে একজনের প্রতি অন্যজনের অনাস্থও সৃষ্টি হচ্ছে। শত্রুতা বৈ আর কিছুই বাড়ছে না এসবের মাধ্যমে।

সাম্প্রতিক স্যোশাল মিডিয়ায় খোলামেলা এই লেখালেখিকে অনেকটা বাঁকা চোখেই দেখছেন দেশের ইসলামী স্কলারগণ। স্যোশাল মিডিয়ায় যেসব তরুণরা লেখালেখি করছেন তাঁদের প্রতি বিনিত অনুরোধ করে তারা বলেছেন, আকাবির ও আসলাফের প্রতি সম্মান জানিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক যেনো কেউ উস্কে না দেয়।

এসব বিষয় থেকে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়? কিংবা কিভাবে ফেসবুকের নিরাপদ ব্যবহার করা যায়? ফেসবুক ব্যবহারের নির্দিষ্ট কোনো কাইটেরিয়া থাকা উচিত কিনা জানতে চেয়েছিলাম দেশখ্যাত স্কলার, ও চট্টগ্রামের ওমরগণি কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন এর কাছে।

স্যোশাল মিডিয়ায় তারা যা কিছু করছে সবই রেকর্ড হচ্ছে: ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন

তিনি বলেন, ‘আজ আমরা পরস্পর ফেসবুকে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে সমালোচনা করছি। যার নামে ইচ্ছে তার নামেই বিরুপ মন্তব্য করছি। কওমি ঘরনার লোকেরাই কওমি লোকদের একে অপরের নামে বিষোদগার করছে। জেনে রাখা দরকার, তারা যা কিছু করছে সবই রেকর্ড হচ্ছে।

চাই তা যেভাবেই করুক না কেনো? রিয়েল আইডি থেকে কারো নামে বিষোদগার করুক কিংবা ফ্যাক আইডি থেকে। সবকিছুই সাইবার ক্রাইম ডিভাইস থেকে রেকর্ড করা হচ্ছে। কেউ যদি আপনার নামে মামলা করে তাহলে নিশ্চিত এগুলো কে, কখন, কোথায় থেকে করছে, সবকিছুই বের করা সম্ভব হবে। তাই ভেবেচিন্তে এসব করা উচিত। যারা এসব করছে আওয়ার ইসলামের মাধ্যমে আমি তাদের সতর্ক করে দিতে চাই।’

তাকওয়া সব মহামারির মহাঔষধ: মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী

কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট বক্তা ও ইসলামী আলোচক মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর সাথে। তিনি বলেন, ‘স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহার এখন অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে গিয়েছে। ফলে বিষয়টি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এজন্য আমরা চরম উদ্ধিগ্ন। উৎকন্ঠিত। এই উদ্ধেগ ও শঙ্কার কোনো শেষ নেই।

যে কোনো বিষয়ের ভালো মন্দ উভয়দিক থাকে। ভালো দিক যেভাবে থাকে খারাপ দিকও থাকে সেভাবেই। মদের ব্যাপারে প্রথম স্তরে যখন হুকুম আসলো তখন কুরআনে কারীমে ইরশাদ হলো, ‘হে নবী আপনি বলুন, মদের মাঝে অনেক ক্ষতি আছে। তবে কিছু উপকারও আছে। তবে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণটা অনেক বেশি।’

তেমনি স্যোশাল মিডিয়া, ফেসবুক ও অন্যান্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কথা সেটাই। যেভাবে কিছুটা লাভ আছে। তেমনি ক্ষতিরও দিক আছে।

লাভের দিক যেমন ইসলামের প্রচার করা। দীনের প্রচার ও প্রসারে সহযোগিতা করা। দীনে হক ও হক্কানিয়াতের বার্তা ছড়িয়ে দেয়া। কেউ যদি ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য স্যোশাল মিডিয়া বা ফেসবুক-টুইটারের ব্যবহার করে তবে এর জন্য আমি সাধূবাদ জানাই।

পাশাপাশি অন্যের ব্যাপারে দুর্নাম রটানো। কারো প্রতি অশোভনীয় মন্তব্যের তীর ছুড়ে দেয়া, অন্যকে আক্রমণ করে পোস্ট দেয়া। অন্যকে ঘায়েল করে বিষোদগার ছড়ানো। অন্য কারো দোষ ঘাটাঘাটি করা। মোটকথা একটি ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করা। এতে করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঘোলাটে হয়ে যায়। পরস্পরে শত্রুতা তৈরি হয়। পরস্পরে যে বন্ধুত্বের ধারা আছে সেটায় শত্রুতায় পরিণত হয়। এগুলো আমি মনে করি খারাপ দিক। ফেসবুকের অনিরাপদ ব্যবহার কূফল।

আমরা যারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বা শিক্ষারত আমরা যদি এ বিষয়টির বৈধতা-অবৈধতা, ভালো দিক ও খারাপ দিক ইত্যাদি যাচাই করে কর্মপদ্ধতি ঠিক করি, তাহলে ফেসবুকের অনিরাপদ ব্যবহার কমবে। তাছাড়া ফেসবুকের অনিরাপদ ব্যবহার বা একজন অন্যজনের প্রতি বিষোদগার, বিশেষ করে কওমি অঙ্গনের ফেসবুক ইউজাররা যেটা করছে সেটা সমাজের অন্য যে কোনো মানুষ ভালো চোখে দেখে না। বরং বাঁকা চোখের রাঙ্গানি লক্ষ করা যাচ্ছে।

স্যোশাল মিডিয়ার এ অনিরাপদ ব্যবহার রোধ করা যায় কিভাবে? এমন প্রশ্ন করলে শোনালেন তাকওয়ার কথা। তিনি বলেন,  ‘সমস্ত অনৈকতা ও অনিয়মরোধের প্রধান ঔষধ হলো তাকওয়া। তাকওয়া সব মহামারির মহাঔষধ। কেউ যদি তাকওয়া অবলম্বন করে তাহলে অন্যের প্রতি গীবত করা কিংবা অন্যের চরিত্রে কালিমা লেপন করা অনেকাংশে কমে যাবে।

আরেকটি হলো মুরুব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করা। মনে করা, যে নিজের থেকে একদিনের বড় সেও আমার থেকে বেশি জানে বা বেশি বুঝে। তাহলে আর তার প্রতি বিদ্ধেষ ছড়ানো হবে না।’

পরিচালনায় ব্যালেন্স রাখা পরিচালকদের জন্য জরুরি: মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া

কথা বলেছিলাম রাজধানী মিরপুরের আরজাবাদ মাদরামার মুহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া এর সাথে।

তিনি বলেন, বিষয়টি অনিয়ন্ত্রিত। প্রত্যেকেই যদি প্রত্যেকের দায়িত্বের জায়গায় সচেতন হয়। তাহলে এসব থেকে বিরত থাকা সম্ভব। একইভাবে নিজেদের অবস্থানের প্রতি লক্ষ করলেও এসব থেকে বেঁচে থাকা যায়। কেউ অন্যায় করলে তার সমালোচনা হতে পারে। সমালোচনা হলে সতর্ক হওয়া যায়। তবে সেটা সবার সামনে, ওপেন সেক্টরে করে সমালোচনার সীমা বা লিমিট ক্রস করা কোনোভাবেই উচিত নয়।

আমি মনে করি বর্তমানে স্যোশাল মিডিয়ায় যা চলছে তা ঠিক হচ্ছে না। সোশ্যাল মিডিয়ার এসব কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি বন্ধ হওয়া উচিত। যদি কোনো মহল কাঁদা ছোড়াছুঁড়ি করে আর তাকে চিহ্নিত করা যায়, তাহলে তাকে সতর্ক করা উচিত। মনে রাখতে হবে, আজ আপনি অন্যের বিরুদ্ধে কলম ধরছেন, একদিন আপনার বিরুদ্ধেও কলম ধরা হতে পারে। কারো বিরুদ্ধে উস্কানি দিয়ে কোনো পোস্ট স্যোশাল মিডিয়ায় করা কখনোই উচিত নয়। শিষ্টাচার বহির্ভূত কোনো আচরণ ফেসবুকের মাধ্যমে প্রকাশ করা সাইবার অপরাধের শামিল।

আর পরিচালক মহল বা যাদের বিষয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় উস্কানি দেয়া হয় তাদেরও উস্কানির সুযোগ না দেয়া উচিত। অধীনস্থদের প্রতি এমন কোনো আচরণ না করা উচিত, যার মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা ফুঁসে উঠে। পরিচালনায় ব্যালেন্স রাখা পরিচালকদের জন্য অত্যান্ত জরুরি।

এমডব্লিউ/

ads