198990

তরুণসমাজকে কীভাবে জুয়া থেকে ফিরিয়ে আনা যায়?

সুফিয়ান ফারাবী
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট>

তোকে ১৭০ রানে ছাড়লাম। জিতলে আমাকে ২০০০ টাকা দিবি। নানা ধরনের খেলা নিয়ে পেশাদার ও অপেশাদার জুয়াড়িদের এমন মন্তব্য চলে চায়ের স্টলগুলোতে। ১৯-২৫ বয়সী তরুণ প্রজন্মকে পেয়ে বসেছে জুয়ার নেশা। অর্থ লোভে অনেকে পেশাও মনে করছেন এটাকে।

ইসলামিক আইন এবং বাংলাদেশের সংবিধানে নিষিদ্ধ জুয়া খেলা বেড়েই চলছে দিন দিন। খেলার মাঠে, চায়ের দোকানে, এমনকি মোবাইলের নানা ধরনের অ্যাপসের মাধ্যমে সর্বগ্রাসী এই ফাঁদে পা দিচ্ছে তরুণ সমাজের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিন্তাশীল সচেতন আলেম ও সাধারণ নাগরিকরা।

বিষয়টি নিয়ে আওয়ার ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছেন, কাতার ধর্মমন্ত্রনালয়ের ইমাম মাওলানা ইউসুফ নূর, লেখক ও গবেষক সৈয়দ শামসুল হুদা ও বিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মাওলানা জাকারিয়া নুর

রাষ্ট্রের সদিচ্ছার অভাব: মাওলানা ইউসুফ নূর

যুগে যুগে পাপের ধরণ পাল্টায়। নতুন নতুন পাপ আবিষ্কৃত হয়। আগে মানুষ তাস দিয়ে জুয়া খেলতো। এখন সেটা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখন আইপিএল, বিপিএল ও জাতীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে বাজি খেলার প্রচলন শুরু হয়েছে। এছাড়া অবাক করা তথ্য হলো, স্মার্টফোনের বিভিন্ন এপস এর মাধ্যমে এখন তরুণ সমাজ জুয়া খেলায় মগ্ন। হাজার হাজার টাকা তারা সেখানেই নষ্ট করে। সর্বহারা হয়ে নেশা, চুরি-ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়।

এর কারণ আমরা আমাদের তরুণ সমাজকে যথেষ্ট কর্মসংস্থান উপহার দিতে পারিনি। এজন্য অবসর সময়ে চায়ের দোকানে জুয়া খেলায় মেতে ওঠে তারা।

এ জন্য প্রশাসনের উচিত সর্বপ্রকার জুয়া বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা। অনলাইনের অ্যাপসগুলো নিষিদ্ধ করা। মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে সোচ্চার হওয়া। জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বর্তমান যে আইন রয়েছে তা ভীতিকর নয়।

জুয়া নির্মূলে খতিবদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা চাই: সৈয়দ শামসুল হুদা

জুয়া খেলার সর্বপ্রথম ক্ষতি হচ্ছে, জুয়ারিদের কাজ করার মানসিকতা নষ্ট হয়ে যায়। তারা মনে মনে ভাবে, চা দোকানে বসে অথবা অনলাইনে সময় কাটিয়ে যেহেতু বিনা পরিশ্রমে টাকা কামানো যায়, তাহলে শুধু শুধু পরিশ্রম করে টাকা কামানোর কী দরকার? কেউ হয়তো জুয়া খেলতে শুরু করেছে, এবং প্রথম দিকে বেশ লাভবান হয়েছে, তারা এমন ধারণা লালন করে। কিন্তু এটা বুঝে না, এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ!

ইদানিংকালে আরেকটা বিষয় লক্ষ করছি, অনলাইনের মাধ্যমে যারা জুয়া খেলছে, তারা জুয়ার ভিন্ন একটি নাম ব্যবহার করে। তাদেরকে কেউ জুয়াখোর বললে চটে যায়। তারা বলে, আমরা জুয়া খেলি না। আমরা গেমলিং করি। এটা এক প্রকার অনলাইন বিজনেস। বাস্তবতা হলো, তারা জুয়া খেলার লজ্জা ইংলিশ শব্দ প্রয়োগ করে আবৃত করতে চায়।

এক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি মসজিদের খতিবদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা উচিত। তারা যদি মসজিদের মিম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে জুয়ার ক্ষতিকর দিক, ভয়াবহ পরিণতি এবং আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে আশা করি ফলপ্রসূ হবে। বর্তমান তরুণ সমাজ বুঝতে শিখবে এই পথে কোন প্রকার কল্যাণ নেই। সুতরাং নিজেকে সর্বহারা না করতে চাইলে এখনই জুয়া পরিহার করতে হবে।

অবসর সময়ে বিনোদনের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে: মাওলানা জাকারিয়া নুর

এ ধরনের গর্হিত কাজ থেকে যুবসমাজকে দূরে সরানোর আহ্বান করার পাশাপাশি ইসলামী শরীয়া মোতাবেক বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। খেলা দেখা, বাজি খেলা অথবা অ্যাপস ভিত্তিক যেসকল কুকর্মে তরুণ সমাজ জড়িত সেসকল কুকর্ম রোধে তাদের উদ্দেশ্যে অনলাইন এবং অফলাইনে সচেতনতামূলক বক্তব্য প্রদান করতে হবে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে, দূরে ঠেলে দিয়ে নয় বরং যারা এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত, তাদেরকে বুকে টেনে নিয়ে যৌক্তিক ভাবে এ সকল অপরাধের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরতে হবে পরিবার, অভিভাবক এবং আলেমদেরকেই।

অনেকের প্রশ্ন তুলে বলেছেন, জুয়া রোধে বর্তমান সংবিধানের আইন কতটা কার্যকর?

কী আছে বর্তমান সংবিধানে?

সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, এ ধরনের জুয়া খেলা দণ্ডনীয় অপরাধ। যে কোনো ঘর, স্থান বা তাঁবু জুয়ার আসর হিসেবে ব্যবহৃত হলে তার মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী, জুয়ার ব্যবস্থাপক বা এতে কোনো সাহায্যকারী তিন মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। এ রকম কোনো ঘরে তাস, পাশা, কাউন্টার বা যে কোনো সরঞ্জামসহ কোনো ব্যক্তিকে জুয়ারত বা উপস্থিত দেখতে পাওয়া গেলে তিনি এক মাস পর্যন্ত কারাদন্ড বা ১০০ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।

তাই অনতিবিলম্বে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এই আইন আরও কঠোর করে পুলিশ এবং প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা উচিত।

ওআই/আবদুল্লাহ তামিম

ads