195362

ইয়াওমে আরাফা বছরের শ্রেষ্ঠ দিন

সাজ্জাদ হুসাইন রাহাত।।

জিলহজ মাসের প্রথম দশক অনেক ফজিলতপূর্ণ। এই দিনগুলোর নেক আমল আল্লাহর নিকট অনেক পছন্দনীয়। বিশেষত জিলহজের ৯ তারিখ যাকে ইয়াওমে আরাফা বলা হয়- এই দিন বছরের শ্রেষ্ঠ দিন।

বছরের শ্রেষ্ঠ রাত যেমন লাইলাতুল কদর, তেমনি শ্রেষ্ঠ দিন হচ্ছে আরাফার দিন। এ দিনে নফল রোজা রাখা অত্যধিক ফজিলতপূর্ণ। হজরত রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, আরাফার দিনের একটি রোজার বদৌলতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আগের-পরের দুই বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

আরাফার দিন কবে?

যেহেতু ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান চন্দ্র মাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সুতরাং জিলহজ মাসের ৯ তারিখই আরাফার দিন হিসেবে পালন করতে হবে। সে হিসেবে চলতি বছর আমাদের বাংলাদেশের আকাশের চাঁদ হিসেবে আরাফার দিন হবে জিলহজের ৯ তারিখ শুক্রবার দিন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সেহরি খাবে।

‘ইয়াওমে আরাফা’ অর্থ নয় জিলহজ। এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। কারণ এই রোযা আরাফা বা উকুফে আরাফার আমল নয়; তা ঐ তারিখের আমল। ‘ইয়াওমে আরাফা’ হচ্ছে ঐ তারিখের (নয় যিলহজের) পারিভাষিক নাম। যেহেতু হজের প্রধান রোকন ‘উকুফে আরাফা’। ঐ স্থানের তারিখ হিসেবে নয় যিলহজে আদায় করা হয় তাই এ তারিখেরই নাম পড়ে গেছে ‘ইয়াওমে আরাফা’। একারণে যেসব আমল আরাফা বা উকুফে আরাফার সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট নয়; বরং জিলহজের নয় তারিখের সাথে সংশ্লিষ্ট, সেগুলোকেও ‘ইয়াওমে আরাফা’র আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, নয় তারিখে বা ঈদের আগের দিন আমলটি করতে হবে।

ইয়াওমে আরাফা অর্থ-নয় যিলহজ এর আরেকটি দৃষ্টান্ত ‘তাকবীরে তাশরীক’। এটি আরাফা বা উকুফে আরাফার বিশেষ আমল নয়। এটি শুরু হয় নয় যিলহজ ফজর থেকে, অথচ যে দলীল দ্বারা নয় তারিখ থেকে তাকবীরে তাশরীক শুরু হওয়া প্রমাণিত তাতেও ‘ইয়াওমে আরাফা’ শব্দই আছে। দলীলের আরবী পাঠ এই- عن علي رضي الله عنه : أنه كان يكبر بعد صلاة الفجر يوم عرفة، إلى صلاة .العصر من آخر أيام التشريق، ويكبر بعد العصر.رواه ابن أبي شيبة في مصنفه وإسناده صحيح كما في الدراية (আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদিস : ৫৬৭৭, ৫৬৭৮)

এখানেও কি ‘ইয়াওমে আরাফা’ অর্থ নয় যিলহজ করা ভুল?

হাদিসে বিভিন্ন শব্দে আরাফার দিনের রোজার কথা আছে। মূলত ‘আরাফার দিন’ এই শব্দটির কারণেই কেও কেও মনে করছেন, আমাদের আরাফার হাজীদের সাথে মিলিয়ে রোজা রাখতে হবে। যদি এই শব্দের জায়গায় ‘৯ ই জিলহজ’ থাকতো তবে কোন ভিন্নমতের সুযোগ ছিলো না।

এবার আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন হাদিসে ‘৯ ই যিলহজ’ শব্দটি এসেছে। সেখানে ‘ইয়াওমে আরফার’ শব্দটিই নেই। যেমন,
১- আবু দাউদ এর হাদিস, عَنْ بَعْضِ، أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ: «كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ، وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ، .وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، أَوَّلَ اثْنَيْنِ مِنَ الشَّهْرِ وَالْخَمِيسَ অর্থ: রাসূল সা. এর কতক স্ত্রী, উম্মাহাতুল মুমিনীন থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ৯ ই যিলহজ রোজা রাখতেন। (মুসনাদে আহমদ- ২২৬৯০, আবু দাউদ- ২৪৩৭, নাসায়ী- ২৩৭২)

দ্বিতীয়ত- এছাড়াও প্রায় সকল ফকীহ, মুহাদ্দিস তাদের কিতাবে লিখেছেন ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য ৯ তারিখ। এখানে কেবল হাম্বলী মাজহাবের শীর্ষ ফকীহ ইবনে কুদামা রহ. এর লেখা উল্লেখ করছি। قال ابن قدامة في ” المغني ” ( 4 / 442 ) : ” فأما يوم عرفة : فهو اليوم التاسع من ذي الحجة ، سمي بذلك لأن الوقوف بعرفة فيه
ইয়াওমে আরাফাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যিলহজ এর নবম দিন। এইদিনকে ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ শব্দে নামকরণ করা হয়েছে কারণ আরাফাতে এইদিনে উকুফ করা হয়। এখানে স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ একটা টার্ম, পরিভাষা মাত্র। উদ্দেশ্য ৯ তারিখ। সেটা যে অঞ্চলের ৯ তারিখই হোক, তাকেও পরিভাষা হিসেবে ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ বলা হবে। এছাড়া আরো দেখুন, তাবারী ২/২৯৭, বাহরুল মুহীত, ২/২৭৫, লিসানুল আরব, ৪/২৮৯৮, আল কামুসুল ফিকহী, মু’জামু লুগাতিল ফুকাহা ইত্যাদি।

তৃতীয়ত-
গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা আছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর।

এটি প্রমাণ করে, ‘ইয়াওমে আরাফা’ একটি তারিখের নাম, আর তা হচ্ছে নয় যিলহজ। যেমন ‘ইয়াওমুন নাহর’ একটি তারিখের নাম, আর তা হচ্ছে দশ যিলহজ। কোনো অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি ঐ অঞ্চলের তারিখ অনুযায়ী ইয়াওমুন নাহরের অর্থ দশ জিলহজ ধরে ইয়াওমে আরাফার এমন কোন অর্থ করেন; যা দ্বারা সেখানের তারিখ হিসেবে তা হয়ে যায় আট যিলহজ! তাহলে সেটা হবে এক উদ্ভট, হাস্যকর ও ইজমা বিরোধী কথা। কারণ ইয়াওমে আরাফা ও ইয়াওমুন নাহরের মাঝে আরেকটি দিন স্বীকার করে নেওয়া ইজমার সরাসরি বিরোধী।

এমডব্লিউ/

ad