194956

মকতবস্কুল শুরু করলাম ১১৩০ টাকা দিয়ে

সালাহ্উদ্দীন জাহাঙ্গীর।।

ছোট চাচার দোতলায় বেশিদিন পড়ানো গেল না মকতবস্কুলের ছাত্রদের। সপ্তাহখানেক পড়ানোর পর চাচার দোতলা থেকে মকতবের ‘ক্যাম্পাস’ আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আমাদের বাড়িতে জায়গা কই? জায়গা অবশ্য আছে, পুরোনো টিনের ঘরটা ফাঁকা পড়ে আছে। ওটাই বছর পাঁচ-ছয় আগে আমাদের থাকবার ঘর ছিল।

উত্তর পাশে একটা ছোটখাটো দালান তোলায় ওই ঘরটাতে আর থাকা হয় না। বেশ বড়সড় টিনের ঘর, পাকা ফ্লোর। এখন স্টোর রুমের মতো হয়ে আছে। ধান-জিরাত রাখা হয়, গোটাকয়েক বাক্সপেটরা, একটা চৌকি, তার ওপর রাজ্যের বস্তা হাবিজাবি।

এ ঘরটাকেই স্কুল বানাতে হবে। কিন্তু তাতে সময় লাগবে দিন দুই। ঘরের যাবতীয় ঠাসবুনট সরাতে হবে। পুবপাশে-দক্ষিণপাশে বিস্তর গাছপালা থাকায় ঘরটা খানিক অন্ধকার। পুরোনো লাইট-ফ্যানের ওয়েরিং নষ্ট হয়ে আছে, সেগুলো মেরামত করে নতুন লাইট-ফ্যান লাগাতে হবে। টাকা পয়সা তো কিছু খসবেই।

এর তিন-চার দিন আগে সাভার গিয়েছিলাম পেয়ারার চারা আনতে, সাভার হর্টিকালচার সেন্টার থেকে। সেই ফাঁকে সাভার অন্ধ মার্কেট থেকে বাচ্চাদের জন্য কয়েক সেট বই নিয়ে এসেছিলাম। নার্সারি, ওয়ান, টু, থ্রি এ চার শ্রেণির ছাত্রদের জন্য মোট ৭ সেট বই কিনেছিলাম। খরচ পড়েছিল ৯৯০ টাকা। এই ৯৯০ আর আগের ৭০+৭০ মোটমাট আমার প্রাথমিক খরচ গেল ১১৩০ টাকা, নিজের পকেট থেকে।

আমাদের মকতবস্কুলের তোড়জোড় দেখে প্রবাস থেকে দুলাভাই জানালেন, তোমাদের এই মহতী উদ্যোগের সঙ্গে আছি আমি। এই নাও নগদ পাঁচ হাজার টাকা। তবে শর্ত হলো, কাজ থামানো যাবে না। তোমাদের উদ্যোগ খুবই প্রয়োজনীয় এবং প্রশংসনীয়। ক্ষুদ্র থেকেই মানুষ বড় হয়। তোমাদের ছাত্র-ছাত্রী যদি পাঁচজনও হয় তবু হতাশ হবে না, কাজ চালিয়ে গেলে সাফল্য আসবেই। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি।

বুকে খানিকটা সাহস জমাট হলো। পোলাপান নিয়ে কাজে নেমে পড়লাম। ঘরের চৌকিটা পুবপাশে এক কোনায় নিয়ে রাখলাম। যাবতীয় বাক্সপেটরা, ছালা-বস্তা সেই চৌকির উপর গুছিয়ে রেখে বাকি ঘরটা খালি করে ফেললাম। এরপর শুরু হলো উপরের পাটাতনের মাকড়সার ঝুল আর ঘুণ পরিষ্কার, নিচের মাটি-ধুলো সাফসুতরো করার কাজ। পোলাপান হল্লা করে কাজ করতে লাগল। এসব কাজে তাদের আগ্রহের কমতি নেই।

ঝাড়-মোছার কাজ শেষ হলে পুরো ঘরটা সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে দিলাম। চাচাতো ভাই আশিক সেমি-ইলেক্ট্রিশিয়ান, তাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন একটা ফ্যান, তিনটে এলইডি বাল্ব, সুইচ-হোল্ডার-কেবল এবং যাবতীয় ইলেক্ট্রিক কাজ শেষ করে মোটামুটি একটা স্কুলঘরে রূপান্তর করে ফেললাম। পরদিন থেকে এখানেই শুরু হলো মকতবস্কুলের যাত্রা। ফ্লোরে প্লাস্টিকের বস্তা কেটে বানানো চট বিছিয়ে দিয়েছি, ওখানেই বসা ওখানেই বই-খাতা। কতক্ষণ পড়ে আর কতক্ষণ মনের আনন্দে লুটোপুটি করে।

আপাতত এখানেই চলছে পড়ানোর কাজ। ছাত্র-ছাত্রী ২০-এর কাছাকাছি। করোনার কারণে কোনো প্রচারণা করা থেকে বিরত থাকছি। পাড়ার ছেলেমেয়ে যারা আছে তারাই নিয়মিত শিক্ষার্থী। আমি, বউ আর চাচাতো ভাই আশিকের বউ পড়াচ্ছি।

শিক্ষকদের কোনো বেতন ধার্য করা হয়নি। পড়ানোর এক মাস তো হলো, তাদের কোনো বেতন দিতে পারব কিনা জানি না। বলেছি, তোমরা আনন্দের সাথে পড়াতে থাকো। বেতন দরকার হলে আমার পকেট থেকে দেবো। অভিভাবকদের কাছে এখনও কোনো বেতন-টেতন চাইনি, লজ্জার মাথাটা এখনও খাওয়া গেল না! ওদিকে তাকিয়ে দেখি আমার পকেট গড়ের মাঠ।

পড়ার জন্য ৮টা বেঞ্চ বানাতে দিয়েছি, মিস্ত্রি খরচ বলেছে ১০ হাজার টাকা। বউ শুনে আঁতকে উঠেন, এত টাকা পাইবেন কই? আমি চোখের ইশারায় আসমানের দিকে দেখাই- ব্যবস্থা হয়ে যাবে, চিন্তা করো না!

এমডব্লিউ/

ad